‘আমার সারা জীবনের স্বপ্ন, বাংলার প্রতিটি তরুণ প্যালিন্ড্রোম সাহিত্য সম্পর্কে জানুক’

‘যারা নতুন কিছু খোঁজে না
একদিন তাদেরও কেউ খুজবে না’

এই কথাকে অনুসরণ করে নতুনত্বের পথে ছুটে চলছেন অতি পরিচিত মুখ ফরিদ উদ্দিন। যে পথ সৃষ্টি হয়েছিল এখন থেকে অনেক বছর আগে। কিন্তু পথিকের পা না পরার কারণে সেই পথ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল অনেকটা। নিজের ভালো লাগা আর ভালোবাসা থেকে ধীরে ধীরে অবরুদ্ধ পথটাকে মসৃণ করার চেষ্টা করছেন। আজ তার কাছে জানার চেষ্টা করবো তার সেই পথের খোঁজ পাওয়া থেকে শুরু করে সেই পথ দিয়ে কতদূর যেতে চান তার সব কিছুই। চেরাগাদানী ডটকমের বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ‘শ্রী লোকনাথ মন্ডল’

চেরাগাদানী: কেমন আছেন?
ফরিদ উদ্দিন: আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
চেরাগাদানী: আপনার এই ব্যস্ততার মাঝে আমাদের সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আমরা দেখেছি কয়েক বছরে প্যালিনড্রোম নিয়ে অনেক কাজ করছেন। আজকে আপনার কাছে সেটা জানতে চাই।
ফরিদ উদ্দিন: ধন্যবাদ! কি জানতে চান বলুন।
চেরাগাদানী:প্যালিন্ড্রোম বিষয়টা যদি বুঝিয়ে বলতেন?
ফরিদ উদ্দিন: ইংরেজি প্যালিন্ড্রোম (Palindrome) শব্দের উৎপত্তি দুটো গ্রিক শব্দ ‘প্যালিন’ (Palin)এবং ‘ড্রোমোস’ (Dromos) থেকে, যার অর্থ যথাক্রমে ‘পিছন’ ও ‘দিক’। যদিও গ্রিকদের কাছে এই রকম শব্দ ‘কারকিনিকে এপিগ্রাফে’ অর্থাৎ কাঁকড়া শব্দ নামে পরিচিত ছিল। প্যালিন্ড্রোমের আবিষ্কার কে করেছিলেন বা কবে করেছিলেন তা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে।

জনশ্রুতি হল, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে গ্রিক সম্রাট দ্বিতীয় টলেমির রাজত্বকালে (২৮৫-২৪৬ খ্রি. পূর্ব) গ্রিক কবি সোতাদেস হলেন প্যালিন্ড্রোমের স্রষ্টা।

চেরাগাদানী: বাহ! বেশ চমৎকার তো! তা প্যালিন্ড্রোমের সাথে কবে পরিচয়, কতদিন পেলিন্ড্রোমের সাথে যুুক্ত আছেন?
ফরিদ উদ্দিন: ২০০৮ খৃষ্টাব্দে পরিচয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত যুক্ত আছি।

চেরাগাদানী: তার মানে প্রায় ১৩ বছর ধরে এর সাথে যুক্ত। প্যালিন্ড্রোম চর্চার ব্যাপারে কিভাবে উৎসাহিত হলেন, শুরুর গল্পটা জানতে চাই।

ফরিদ উদ্দিন: ২০০৭ খৃষ্টাব্দে বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলে চাকরিতে যোগদান করি। ২০০৮ খৃষ্টাব্দে তৎকালীন ছাত্র মেহেদী মাইনুল ও শুভ্র চক্রবর্তী এবং অনন্য ছাত্রদের সহযোগিতায় বই পড়া শুরু করি। একসময় ভাবলাম দেখি তো চেষ্টা করে কিছু লেখা যায় কিনা? কবিতা লিখতে শুরু করলাম। একসময় আমার প্রিয় বন্ধু মোঃ নূরুল ইসলাম রনজুর সাহায্য নিলাম। সে তো এই কথা শুনে হাসতে হাসতে বললো শালা কবি হবি? সাহিত্যিক হবি? আমি বললাম, দোস্ত মজা নে ঠিক আছে কিন্তু একদম ইউনিক ধারণা দে যা পূর্বে কেউ লেখেননি বা লিখলেও পরিপূর্ণ ভাবে লেখেননি। তখন সে বললো তাহলে এভাবে লিখ্ শালা।
“ফুলেল বই পড়ো, বই ফুলেল”।

আমি বললাম এটা কী নিয়ম? সে বললো শালা লক্ষ্য করে দ্যাখ শব্দগুলো ডান ও বাম দিক থেকে পড়লে অর্থ একই হয়।
হ্যাঁ তাই তো। এই ধরনের কবিতার নাম কি? বন্ধু বললো আমি নিজেও জানি না। নতুন চিন্তা চাইলে তাই বললাম। পরে আমি দ্বিতীয় বাক্য লিখলাম

আনন্দে উৎসাহে মনের উৎসাহে আনন্দে। তারপর পুরো একটি কবিতা লিখে ফেললাম। এই কবিতা লিখতে সময় লাগে প্রায় এক মাস। এক রাতে বসে এই কবিতা লিখছিলাম হঠাৎ হলের প্রিয় ছাত্র (সিএসই ডিপার্টমেন্ট) তিনি বললেন কি লিখেছেন ফরিদ ভাই?

আমি বললাম কবিতা। দেখতো কি কবিতা? বাহ চমৎকার তো। আমি বললাম ভাই এই কবিতা কারোর সাথে মিলবে না। তিনি বললেন কেন? আমি বললাম লক্ষ্য করে দেখুন, প্রতিটি শব্দ ডান ও বাম দিক থেকে পড়লে অর্থ একই হয়। তিনি সাথে সাথে বলে ফেললেন, এটা প্যালিন্ড্রোম সিস্টেম।

বললাম ভাই বিষয়টি বুঝিনি। বুঝিয়ে বলবেন? তখন তিনি বললেন, এটা অংকের বিষয়। আমাদের সিএসই ডিপার্টমেন্টে প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ করতে হয়। সেখানে এই বিষয়টি আছে। আমি আবার বললাম, বিষয়টি আরো সুন্দর করে বুঝিয়ে বলবেন। তিনি বললেন, যেমন ১১১,২২২ ইত্যাদি।

বললাম বাহ দারুণ তো! তয় ভাই এই বিষয়টি সাহিত্য আছে? তিনি বললেন মনে হয় না।
সারারাত এটা নিয়ে ভাবলাম। এভাবে সাতদিন পর মনে হলো বিষয়টি যেহেতু অংকের তাহলে কোনো না কোনো ভাবে তা সাহিত্যের সাথে সম্পৃক্ত। কয়েক সপ্তাহ পর আরেক ছাত্রের সাহায্য নিলাম। তিনি বিশ্ব সাহিত্য প্যালিন্ড্রোমের ইতিহাস তুলে ধরলেন এবং জানালেন বাংলা ভাষায় মাত্র এই চার লাইন পেয়েছি। তবে ইংরেজি সাহিত্যসহ আরো অনেক সাহিত্য অভাব নেই। মনে মনে ভাবছিলাম, বাহ আমার ধারণা তাহলে সত্যি হলো!

চারটি বাক্য ছিলো- “রাধা নাচে অচেনা ধারা
রাজন্যগণ তরঙ্গরত নগণ্য জরা
কীলকসঙ্গ নয়নঙ্গ সকলকী
কীর্তন মঞ্চ পরে পঞ্চম নর্তকী।”

লেখা ছিলো এই চারটি লাইন শরৎচন্দ্র পন্ডিত দাদা ঠাকুরের লেখা। কিন্তু পরে জানতে পারি উপরের তিনটি বাক্য বাংলাদেশের সন্তান সৌমিত্র চক্রবর্তী তিনি ঝিনেদাহ ক্যাডেট কলেজে পড়াকালীল লিখেন। এরপর অভিধান কিনে গবেষণা শুরু করলাম। সারারাত ডিউটি করি আর গবেষণা করি। এভাবে আট বছর রাতে ডিউটি করে গবেষণা শেষ করে, আরেক ছাত্র তাঁর কাছে শেয়ার করলাম। তিনি সাতদিন পর জানালেন, আপনার গবেষণা সঠিক। এখন আপনি কি করতে চান? আমি বললাম, দাদা বিষয়টি সবার কাছে শেয়ার করতে চাই।

তিনি বললেন, না। আপনি এটা করবেন না। তা করলে কোন বিজ্ঞ লোক আপনার চিন্তা চুরি করতে পারে। তাই আপনি যা পারেন তাই লিখে বই প্রকাশ করুন। এতে আপনি ইতিহাসের সাক্ষী হবেন। কারণ এ ধরনের বই আমার জানা মতে পূর্বে বাংলা সাহিত্য কেউ লেখেননি আর আমি তো আপনার মাধ্যমে জানলাম। আর মনে রাখবেন বিষয়টি কঠিন তবে অসম্ভব নয়। আপনি প্রচার শুরু করুন আপনার মতো।

তিনি কিছু অগ্রীম কথা বলছিলেন। তা না বললেই নয়।

প্রথম অবস্থায় আপনাকে নিয়ে সবাই হাসবে,পাগল বলবে, গালাগালি করবে। এটা দিয়ে কিছু হবে না। এটা শিখে লাভ কী ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে আপনার কাজ আপনি চালিয়ে যাবেন। আমার বিশ্বাস এটা মানুষ গ্রহণ করবেন। বাজারে অনেক বই লেখা হবে। একসময় পাঠ্যবইয়েও আসবে। তার জন্য দরকার সময়।

চেরাগাদানী: বাহ! তবে বোঝা ই যাচ্ছে শুরুটা বেশ চ্যালিঞ্জিং ছিল। প্যালিন্ড্রোম নিয়ে কী কী কাজ করেছেন?
ফরিদ উদ্দিন: তেমন কিছু নেই। কেবল শুরু করেছি। চেষ্টা করছি মানুষের মাঝে বিষয়টি ছড়িয়ে দিতে। “কথা থাক” বইটি বাংলা ভাষায় প্রথম। এটা আমার মৌলিক বই। তারপর সবার সহযোগিতায় সম্পাদনা করলাম ” নব প্লাবন, নব যৌবন “। বর্তমানে বাজারে ” মাটি মা”, “প্যালিন্ড্রোম কবিতাবলী ” নামে আরো দুটো বই আছে। বইগুলো চমৎকার লেখা হয়েছে। সবগুলো বই প্যালিন্ড্রোম।

চেরাগাদানী: শুরুতে কিছুই ছিল না, আপনার “কথা থাক” দিয়ে শুরু করলেন। ভুল না করলে সেটি ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়। আর এখন ২০২১ সাল, আপনি বই প্রকাশ করার দুই বছরে পাঁচের অধিক বই বের হয়েছে। ব্যাপারটা সত্যি প্রশংসার দবি রাখে। প্যালিন্ড্রোম নিয়ে কাজ করে কেমন সাড়া পেয়েছেন এবং কাজ করতে গিয়ে কি কি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছেন?

ফরিদ উদ্দিন: বেশ সাড়া পেয়েছি। এখন তো আমার চেয়ে হাজার গুণে ভালো লেখেন অনেকে। প্রতিবন্ধকতার বলতে দুই একজন যারা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। এটা শিখে লাভ কী? এটা কী কাজে আসবে? ইত্যাদি ইত্যাদি।

চেরাগাদানী: আসলে নতুন কিছু আসলে তার সমালোচনা প্রশংসা দুটোই থাকবে। আর সে সমালোচনাকে পরিশ্রম দিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়াটাই উত্তম। আপনারা সেটি ই করে যাচ্ছেন দেখতে পাচ্ছি। প্যালিনড্রোম নিয়ে কাজ করার সময় আপনার সবচেয়ে আনন্দ এবং বেদনার কথা শুনতে চাই।

ফরিদ উদ্দিন: আনন্দ এক ঝাঁক। বলে শেষ করা যাবে না। তবে অধ্যাপক ড.সৌমিত্র শেখর বাংলা বিভাগ ঢাবি, স্যারের উৎসাহ ছিলো সবচেয়ে আনন্দের।
চেরাগাদানী: আপনার থেকে উৎসাহিত হয়ে অনেকেই প্যালিনড্রোম নিয়ে লিখতে সাহস করছে। আপনার কী মনে হয় নতুনরা কতটা লেগে থাকতে পারবে?
ফরিদ উদ্দিন: অবশ্যই পারবে এটা আমার বিশ্বাস। আমি আছি তাদের সঙ্গে সবসময়।
চেরাগাদানী: নতুন যারা লিখছেন তারাও হয়তো জানেন আপনাকে সবসময় তাদের পাশে পাবেন।কারণ তারা আপনাকে পথপর্দশক হিসেবে মানেন। এ নিয়ে যদি কিছু বলেন।
ফরিদ উদ্দিন: পথপ্রদর্শক হিসাবে মানে কি না জানি না। তবে তারা আমাকে ভালোবাসেন। ভালোবেসে কাজটি করছেন।
চেরাগাদানী: তাদের সে ভালোবাসা চিরকাল থাকুক সে প্রত্যাশা করি সবসময়। আমরা সবাই জানি বাংলা সাহিত্য অনেক কঠিন। সেখানে সীমাবব্ধ একটি দিক দিয়ে সাহিত্য! অনেকে তো বলেই ফেলেন প্যালিনড্রোম দিয়ে সাহিত্য করা যাবে না। সেক্ষেত্রে কি বলবেন?

ফরিদ উদ্দিন: ভুল ধারণা তাদের। আজ থেকে বহু বছর আগে শরৎচন্দ্র পন্ডিত দাদা ঠাকুর মাত্র ১০ থেকে ২০ টি বাক্য লিখেন। আজ গান, গজল, কীর্তন, কবিতা এমনকি সনেটও লেখা হয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন সনেট লিখবেন বলে ঘোষণা দেন তখন সবাই বলছিল এটা অসম্ভব। তবে হ্যাঁ সময় বলে দিবে সাহিত্য কি না।

চেরাগাদানী: আশা করি সময় তাদের যথাযথ উত্তর দিবে। বাংলা প্যালিন্ড্রোম নিয়ে আপনার ভবিষৎ পরিকল্পনা জানতে চাই।
ফরিদ উদ্দিন: চেষ্টা করছি বাংলার প্রতিটি তরুণ বিষয়টি জানুক। জেলা পর্যায়ে সরকারি স্কুলে এ নিয়ে আলোচনা করার পরিকল্পনা আছে।
চেরাগাদানী: পরিকল্পনা বাস্তব হোক। আপনার অনেক সময় নিয়ে ফেলাম। প্যালিনড্রোম নম্বর দিয়েই আমার প্রশ্ন শেষ করছি, প্যালিন্ড্রোম নিয়ে আপনার আশা কী?
ফরিদ উদ্দিন: আশা অনেক বড়ো। আমি চাই সীমিত আকারে পাঠ্যবইয়ে আসুক।
চেরাগাদানী: আমাদের সময় দিয়ে, মূল্যবান মতামত দেবার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। শুভকামনা রইল আপনার জন্য ও আপনার মতো যারা নতুনের পথে হাটার চেষ্টা করছেন।
ফরিদ উদ্দিন: ভালোবাসা জানবেন।