আল্লামা লুৎফর রহমান ও তার জীবন

আল্লামা লুৎফর রহমান। বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম, জনপ্রিয় ইসলামিক বক্তা, গবেষক ও বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরিনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওয়াজ-মাহফিলে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মুসলমানদের সচেতন করতেন।

১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার করপাড়া ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন লুৎফর রহমান। তার পিতা মাওলানা আব্দুস সামাদ রহ. পেশায় একজন আলেম এবং সমাজসেবী ছিলেন। মাতা মরহুমা বেগম মাকসুদা খাতুন গৃহিণী ছিলেন। ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।

আল্লামা লুৎফর রহমানের পিতা মাওলানা আব্দুস সামাদ অত্যন্ত বুজুর্গ আলেম ছিলেন। বাবার হাতেই তিনি ইসলামী শিক্ষার সূচনা করেন। এছাড়া তিনি ১৯৬১ সালে কালাইয়া রব্বানিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, ১৯৬৩ সালে রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম, ১৯৬৫ সালে ফাজিল এবং ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সাথে কামিল পাশ করেন।

ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছাত্র জীবনের সকল পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস এবং স্কলারশিপ প্রাপ্ত একজন মেধাবী মুখ হিসেবে পরিচিত। তিনি বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি এবং সংস্কৃতি ভাষাসহ বহু ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

আল্লামা লুৎফর রহমান কর্মজীবনে রাজখালী আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ধর্মীয় আলোচনা শুরু করেন ইমামগঞ্জ (নাগেরহাট) কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমামের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্যে দিয়ে। কর্মজীবনের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন অগ্রগতিতে সর্বদা নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। নিজ উদ্যোগে তিনি অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, ইসলামী পাঠাগার দেশে-বিদেশে প্রতিষ্ঠা করেন। একজন স্বনামধন্য বক্তা হিসেবে দেশে-বিদেশে বহুল পরিচিত আল্লামা লুৎফর রহমান।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ইসলামের দাওয়াত বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, কোরিয়া, জাপানসহ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অসংখ্য দেশে ভ্রমণ করেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই মুফাসসিরে কোরআন। তার ওয়াজ শুনে অনেক অমুসলিম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। কোরআন প্রচারের পাশাপাশি তিনি অনেক দুর্লভ গ্রন্থ রচনা করে দেশবিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।

তিনি ছাত্র জীবন থেকেই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথে কাজ করেছেন। অতঃপর বৃহত্তর সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর করুক হয়ে আজীবন ইকামাতে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে গেছেন। এবং ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) নির্বাচনী এলাকায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজ যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন।

ছাত্র জীবনে তিনি রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসায় ফাজিলে অধ্যয়নকালে তার শিক্ষক মাওলানা নুরুর রহমানের অনুপ্রেরণায় তিনি জিএস পদে নির্বাচন করে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে কামিলে অধ্যয়নকালে ভিপি নির্বাচিত হন। পাশাপাশি একই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নির্বাচিত হন। কিছুদিন পর পর-ই বাংলাদেশ জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন।

আল্লামা লুৎফর রহমানের প্রকাশিত গ্রন্থাবলি
চার ইমামের জীবনী
আল কোরআনের বিষয়ভিত্তিক অভিধান
আসান ফেকাহ্‌ (১ম ও ২য় খণ্ড একত্রে)
তাম্বিহুল গাফেলিন
মুসলিম জাহানের – চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রা.
ইসলামের ফরজ বিধান পর্দা (সাদা)
মুসলিম জাহানের চার খলিফার জীবনী
মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক রা.
ইসলামে চারিত্রিক পবিত্রতা ও সতীত্ব রক্ষার বিধান

আল্লামা লুৎফর রহমান ২০২৪ সালের ৩ মার্চ (রোববার) দুপুর ২ টা ৫৪ মিনিটে রাজধানী ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তাকে ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে ব্রেনের অপারেশন করা হয়। তারপর থেকে আর জ্ঞান ফিরেনি তার।