আসিফ মেহদী’র সাইন্স ফিকশন বই ‘আড়াল’

এস.এম. তৌফিক।।

আমি চোখ খোলার চেষ্টা করতেই ভড়কে গেলাম। কী আশ্চর্য; চোখের পাতা যেন গভীরভাবে আটকে গেছে! প্রবল ঘুমের ঘোরে থাকলে আমাদের চোখের পাতা যেভাবে আটকে থাকতে চায়, সেভাবে পাতা আটকে আছে। অনেক কষ্টে তাকিয়ে দেখি, ট্রেনের ভেতরে আমার সব বন্ধু আতঙ্কিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আহে আর বলছে, ‘অ্যাই, চওখ খোল, চোখ খোল।’ আমি তাকাতেই চিকু চেঁচিয়ে উঠল, ‘কুক, কী হয়েছিল তোর!’

সব ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু হঠাৎ এক দুঃস্বপ্ন আমাকে করে তুলেছে অস্বাভাবিক, অস্থির! কিছুদিন হলো কিন্তুতকিমাকার এক স্বপ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। হয়তো স্বপ্ন বলাও ঠিক হচ্ছে না। স্বপ্ন তো রঙ, ঘ্রাণ, প্রাণস্পন্দনে এতটা বাস্তবিক হয় না। অদ্ভুতূড়ে কিছু ঘটছে আমার সঙ্গে।

এটি কানেকশনের গল্প। এক সংযোগের গল্প। কারও মতে দুঃস্বপ্ন, কারও মতে আধিভৌতিক, আবার কারও মতে সমান্তরাল বিশ্ব। যাত্রা গহিন অরণ্যে। কটকা পয়েন্ট- জামতলা সৈকত- তারপর আড়ালের গল্প।

নামকরণ: বইটিতে একটি প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল বিশ্বের ধারণা থেকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানে হচ্ছে, এক বিশ্বের আড়ালে একইরকম আরেকটি বিশ্ব৷ ঠিক এই কারণেই বইটির নাম ‘আড়াল’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। যা গল্পের মূল বিষয়টিকে প্রতিনিধিত্ব করে পাঠকের নজর কাড়বে সহজেই।

প্রচ্ছদ কথন: বইটির নাম ও গল্পের সাথে মিল রেখেই রহস্যময় একটি প্রচ্ছদ করেছেন প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ। বরাবরের মতই ধ্রুব এষ এ বইটির প্রচ্ছদ করার ক্ষেত্রেও নিজের সুনিপুণ কাজের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। আড়াল বইটির মূল থিম প্যারালাল ইউনিভার্স এবং সাউল এক্সচেঞ্জ এর সাথে মিল রেখে প্রচ্ছদটি করা হয়েছে যা পাঠককে মূহুর্তেই সাই-ফাই ভাবনার দিকে ঠেলে দিবে বলে মনে করি।

সাহিত্যের প্রতি আসিফ মেহ্‌দীর ঝোঁক ছাত্রজীবন থেকেই। দেশসেরা দুই ফান ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’ ও ‘রস+আলো’তে লেখার সুবাদে রম্যলেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন আগেই। সেই সূত্রে প্রথম বইটাও রম্যগল্পের। ‘বেতাল রম্য’ নামের সেই বইয়েই আসিফ মেহ্‌দী লাভ করেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। এরপর একে একে প্রকাশিত তাঁর প্রতিটি বই শুধু পাঠকপ্রিয়তাই লাভ করেনি, উঠে এসেছে বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায়। সাম্প্রতিক সময়ে লিখছেন দেশসেরা কিশোর ম্যাগাজিন ‘কিশোর আলো’তে। ব্যঙ্গ আর হাসির সঙ্গে গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটিয়েই আসিফ মেহ্‌দী এ সময়ের জনপ্রিয় লেখকদের কাতারে নিজের অবস্থানটা বেশ পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন।

এসএসসি ও এইচএসসি দুই পরীক্ষাতেই ঢাকা বোর্ডে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্ট্যান্ড করেছেন আসিফ মেহ্‌দী। বুয়েট-এ ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করেছেন। ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় নিজ ক্যাডারে ১ম স্থান অধিকার করেন।

উৎসর্গ: বইটি লেখক কবি মোস্তফা মাহাতিরকে উৎসর্গ করেছেন৷ যার তাগিদ লেখককে তার লেখার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছে বিভিন্নভাবে।

চরিত্র: চিকু, বাবু, ডিএফ, কুক, রেনি, নিপা, বিজ্ঞানী গ্রাগি, নেহা এবং আরো অনেকে।

কাহিনী সংক্ষেপ: গল্পটি মূলত একই ব্যাচের চারজন বন্ধুর সুন্দরবনে ঘুরতে যাওয়া নিয়ে যেখানে তাদের সাথে যুক্ত হয় রেনি ও নিপা নামের দুই বান্ধুবী। গল্পটি আসলে একইবয়সী কিছু তরুণ-তরূণীদের ভ্রমণকাহিনী মনে হলেও এর আড়ালে লেখক সাই-ফাই ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। গল্পের মূল বিষয় হচ্ছে প্যারালাল ইউনিভার্স এবং সাউল এক্সচেঞ্জ। যেখানে আমাদের এই পৃথিবীর আড়ালে থাকবে আরেক পৃথিবীর গল্প। গল্পে দেখা যাবে কুক এর সাথে অন্য জগতের একজন বিজ্ঞানী গ্রেগ তার সাউল এক্সচেঞ্জ হয় এবং কুক প্রথমে এটিকে দুঃস্বপ্ন ভাবলেও পরবর্তীতে ঘটনা ক্রমে সে এবং তার তিন বন্ধু সেই জগতে প্রবেশ করে বিজ্ঞানী গ্রেগ এর সাক্ষাত পায় এবং একটা সময় সে বুঝতে পারে যে আসলে সবই সত্য। তার সাথে বিজ্ঞানী গ্রেগ সাউল এক্সচেঞ্জ করতে সক্ষম হয়েছে এবং বিজ্ঞানী গ্রেগ এবং কুক দেখতে একই চেহারার হওয়ায় কুকের কাছে তা দুঃস্বপ্ন মনে হয়েছিল।

পর্যালোচনা: গল্পটি প্রথমদিকে মনে হবে কোনো একটি ভ্রমণকাহিনী। কিন্তু বইয়ের পাতা উলটে যতই পাঠক সামনের দিকে এগুতে থাকবে তার কৌতুহল বৃদ্ধি পেতে থাকবে। পাঠক ঠিক কখন সাই-ফাই জগতের ভাবনায় বুদ হয়ে যাবে হয়তো নিজেও বুঝতে পারবে না। গল্পটি আসলে একইবয়সী কিছু তরুণ-তরূণীদের ভ্রমণকাহিনী মনে হলেও এর আড়ালে লেখক সাই-ফাই ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন দারুণভাবে। গল্পটি যেহেতু বন্ধুদের একটি গ্রুপ নিয়ে সেদিক থেকে হাস্যরসের দিকটিও যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা খুবই প্রশংসনীয়। গল্পটিতে সুন্দরবনসহ অন্যান্য স্থানের যেভাবে নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন তার সাথে পাল্লা দিয়ে প্যারালাল ইউনিভার্স এর কাল্পনিক ঘটনাও এগিয়েছে সমানভাবে পাল্লা দিয়ে।

প্রিয় লাইন: আমাদের দলের বাকি তিনজন যখন আলাভোলা গোছের, তখন বাস্তববাদী এমন একজনের প্রয়োজনীয়তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

জীবন দুঃস্বপ্নের মতো না; জীবন সুখস্বপ্নের মতো চমৎকার।

হাসি ছোঁয়া গেলে বা ধরা গেলে আমি হয়তো তা ধরে কোনো বয়ামে পুরে রাখতাম আজীবন।

বিশেষ দিক: বইটির সবচেয়ে দারুণ ব্যাপারটি হচ্ছে গল্পে সাইন্স ফিকশন, ভ্রমণকাহিনী, রম্য একইসাথে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে । এ গল্পে লেখকের উপস্থাপনের আমাকে মুগ্ধ করেছে। গল্পের প্লট, ধারাবিবরণী এবং নিখুঁত বর্ণনা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এছাড়াও গল্পটিতে হাস্যরসের কিছু লাইন বইটিকে আলাদাভাবে পরিচয় দাড় করানোর জন্য যথেষ্ট বলে মনে করি।

ব্যাক্তিগত রেটিংঃ ৭.৫/১০

উপসংহার: বইটি পড়ে একজন লেখকের সাইন্স ফিকশন বিশেষ করে সাই-ফাই প্রেমীদের ভাবনার মাত্রাকে আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে মনে করি। পাঠক কখন যে ভ্রমণকাহিনী পড়ছে, কখন বন্ধুদের আড্ডায় ঘটে যাওয়া হাসি-তামাশায় আছে,আবার কখন সে সাই-ফাই জগতে ডুবে যাচ্ছে বুঝে উঠার উপায় নেই। বইটি পড়ার পর লেখকের অন্যান্য বইগুলোও পড়ার জন্য মনে আগ্রহ জাগবে, উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে পরবর্তী বইয়ের অপেক্ষায় এমনটাই আশা করা যায়।

এক নজরে বই;

বই: আড়াল
ধরণ: সমকালীন উপন্যাস।
লেখক: আসিফ মেহদী।
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ।
প্রকাশনী: অনিন্দ্য প্রকাশ।
মলাট মূল্য: ১৫০/-