ক্যারিয়ার নির্বাচনের যে বিষয়গুলো মাথায় রাখবেন

ক্যারিয়ার কি? ক্যারিয়ার হলো- শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে অর্জিত এমন এক কর্ম যেখানে ব্যক্তির সমগ্র কর্মজীবনে গুণগত এবং অভিজ্ঞতা সম্পর্কিত উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি আসে, দায়িত্বের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায় এবং জীবন যাপনে পর্যাপ্ত অর্থের নিশ্চয়তা থাকে।

অনেকে মনে করে, স্মার্ট ক্যারিয়ার মানেই চাকরি। ক্যারিয়ার শুধু চাকরিতেই সিমাবদ্ধ নয়। পরিবারের পছন্দ, বড়দের পরামর্শ শুনে নিদিষ্ট একটি চাকরি বেছে নেয়। কিছুদিন পর সে চাকরি করতে আর ভালো লাগে না। পরিবারের চাপ বা দায়িত্বের কারণে তা ছাড়তেও পারে না। তখন ক্যারিয়ার হয়ে পরে বোঝা।

গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকায় একজন মানুষ গড়ে ৩বার তার ক্যারিয়ার পাল্টায়। বাংলাদেশে সেটা চাইলেও সম্ভব হয় না, কারণ আমরা শুধু মাত্র একটা কাজের জন্যই তৈরি হই, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের এটাই শেখায়। আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ৮৯% মানুষই তাদের চাকরি পছন্দ করে না, এবং তারা পরিবর্তন করতে চায়। এ সমস্যাগুলোর সমাধান একভাবেই করা যায়। শুরুতেই নিজের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং- এ সচেতন হওয়া, আর সে হিসেবে নিজেকে তৈরি করা।

ক্যারিয়ার প্ল্যানিং করবেন কীভাবে?
SWOT Analysis এর মাধ্যমে নিজের সম্পর্কে জানা: আমরা নিজেকেই জানি না। জানি না নিজের শক্তিশালী ও দুর্বল দিকগুলো। SWOT Analysis এর মাধ্যমে নিজের সম্পর্কে জানা। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে নিজের শক্তিশালী আর দুর্বল দিক সম্পর্কে যেমন জানা যায়, তেমনি ধারণা পাওয়া যায় পছন্দের ক্ষেত্রগুলোতে কাজের সফলতার সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে।
নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকলে অবশ্য এই পদ্ধতি বিশেষ কোনো কাজে দেবে না। SWOT Analysis এর মাধ্যমে স্পষ্ট ধারনা পাওয়া যায়, ঠিক কোন ক্ষেত্র নিয়ে আপনি ক্যারিয়ারে এগুতে চান। SWOT চারটি ইংরেজি শব্দের প্রথম অক্ষর দিয়ে বানানো।
S- Strength
W- Weakness
O- Opportunities
T- Threats

Strength- এর সাথে আসে Opportunity। পরখ করে বুঝে নিন, আপনার Strength কোথায়। সেই জায়গায় Opportunities কী কী, সেগুলো বিবেচনা করে দেখুন। Weakness- এর সাথে আসে Threat। পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়লেও কিছু ক্ষেত্রে তো বিড়ম্বনার সৃষ্টি হবেই। সেগুলোও বিবেচনা করে দেখুন।
SOWT -কে নির্ধারণের জন্য সহজ একটি ক্যারিয়ার শিক্ষা হিসেবে কাজে লাগাতে পারেন। বিজ্ঞান ভালো না লাগলে, ব্যবসায় শিক্ষার বইগুলো ঘেঁটে দেখুন। মানবিকের বইগুলো পড়ে দেখুন। কোনো না কোনো কিছু তো ভালো লেগেই যাবে।

প্ল্যানিং শুরু করো মাধ্যমিক থেকেই
ক্যারিয়ার প্ল্যানিং শুরু করা উচিত মাধ্যমিক বা তারও আগে থেকে। তখন থেকে রিসার্চ করা উচিত কোন ফিল্ডের ডিমান্ড ৪-৫ বছর পর অনেক ভাল থাকবে, সে ফিল্ডে যে কাজ করতে হবে, সেসব কাজে আগ্রহ আছে কিনা, কাজগুলো পছন্দ কিনা। তারপর ভাবতে হবে সে কাজ করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাতেও কিছু শেখানো হচ্ছে কিনা। সে কাজ করতে হলে কী কী শেখা দরকার তা শিখতে হবে।

আয়ের দিকটাও মাথায় রাখা জরুরি
ক্যারিয়ার বলতেই আমরা অর্থ উপার্জনের মাধ্যমকে বুঝি। লেখাপড়া শেষ করে একটা ভাল বেতনের চাকরি পেতে হবে, এটাই অনেকের এক মাত্র ভিশন। যদিও ক্যারিয়ার নির্বাচনে সবচে’ জরুরি বিষয় এটি নয়, তবে দায়বদ্ধতার কারণে এটা আগে ভাবতে হয়। যে ফিল্ডগুলোর ডিমান্ড ৪-৫ বছর পরেও বাড়বে, সেগুলোর দিকে নজর দেয়া উচিত হবে। এটা জানার জন্য ইন্টারনেট ঘেঁটে বিভিন্ন খবর, প্রতিবেদন পড়তে হবে। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণগুলো খুঁজে পড়তে হবে।

সিদ্ধান্ত নেবার আগে সময় নিন
যে বিষয় পড়তে ভালো লাগে, আনন্দ পান সেটা খুঁজে বের করুন। আপনার ভালো লাগাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিন। দ্বিধায় পড়ে কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না। সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবার পর দ্বিধায় ভুগলে চলবে না। সিদ্ধান্তে দ্বিধা ঢুকে গেলে, দ্বিধা আপনাকে আরও ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যাবে। তাই লক্ষ্যে অবিচল থাকার জন্য, ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিন।
এই সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে আপনাকে সাহায্য করতে পারে কিছু বই। নিচে কয়েকটি বইয়ের তালিকা দিচ্ছি। এই বইগুলো তোমাকে ‘ক্যারিয়ার কি’ থেকে শুরু করে, ক্যারিয়ার প্ল্যানিং এর আদ্যোপান্ত বুঝিয়ে দিবে। এমনকি তোমার পছন্দের ক্যারিয়ার নির্ধারণ করতেও সাহায্য করবে।

The 7 Habits of Highly Effective People- Stephen R. Covey
Rich Dad Poor Dad- Robert Kiyosaki and Sharon Lechter
The Leader Who Had No Title- Robin Sharma
The Monk Who Sold His Ferrari- Robin Sharma
Eat That Frog- Brian Tracy
The Art of The Deal- Donald Trump and Tony Schwartz
Man’s Search for Meaning- Victor Frankl
The Subtle Art of Not Giving a F*ck- Mark Manson

নিজের ইচ্ছা বনাম মা-বাবার স্বপ্ন
নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিন পাশাপাশি বাবা-মায়ের মতামতকেও বিবেচনা করে দেখুন। মনে রাখবেন, তারা কখনোই আপনার খারাপ চান না। যেহেতু জীবন ও জগত নিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা বেশি, তাই তাদের মতামতকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন। তাদের স্বপ্নগুলোকে পূরণ করার চেষ্টা করতেই পারেন। তবে, নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে না। নিজের মনের বিরুদ্ধে গিয়ে আপনি কোনদিনই সফলতা অর্জন করতে পারবেন না। মা-বাবার সাথে মতের অমিল হতেই পারে। এক্ষেত্রে আপনি যা করতে পারেন, মা-বাবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন।

দুজনের সাথে সম্ভব না হলে, অন্তত একজনের সাথে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলুন যিনি আপনাকে বুঝতে পারবেন। বাবা-মাকে নিরাশ করে ক্যারিয়ার নিয়ে শান্তিতে এগোতে পারবেন না তাই চেষ্টা করুন তাদের বন্ধু বানাতে। সবকিছু শেয়ার করুন। বাইরে খেতে বা ঘুরতে যান। আনন্দের মূহুর্তগুলোতেই নিজেকে তাদের সামনে প্রকাশ করুন। আপনার ভালো লাগা-খারাপ লাগার কথা জানান। আপনার পছন্দ ও পছন্দের ক্যারিয়ার কি- এটা নিয়েও আলাপ করুন।
আপাতদৃষ্টিতে এটা ভীষণ কঠিন মনে হতে পারে। তবে অল্প অল্প চেষ্টা করলে দেখবেন বিষয়টা কঠিন না। বাবা-মায়ের সাথে আপনার ভালো সম্পর্ক শুধু আপনার ক্যারিয়ার না, জীবনের সবকিছুকেই অনেক সহজ আর সুন্দর করে দিবে।

চাকুরি আর ক্যারিয়ার কিন্তু এক না!
অধিকাংশের ক্যারিয়ার প্ল্যানেই চাকরি থাকে। যদিও, চাকরি আর ক্যারিয়ার এক জিনিস না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার এসব ছাড়াও অনেক ক্যারিয়ার পথ আছে, যাতে অনেকেই সফল হচ্ছে। যেমন ফটোগ্রাফি, ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, মেক-আপ আর্টিস্ট, স্টাইলিস্ট, ক্যারিয়ার গ্রুমিং, কর্পোরেট ট্রেইনার, পাবলিক স্পিকার, ফ্যাশন ডিজাইনিং, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, ফিল্ম মেকিং, ব্লগিং ইত্যাদি।

এসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার খুব একটা সুযোগ নেই বাংলাদেশে, তবে এসব বিষয়ে তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়েও ব্যবহারিক বা প্র্যাকটিকালি শেখার প্রয়োজন খুব বেশি। উদ্যোক্তা হওয়া বর্তমানে জনপ্রিয় একটি ক্যারিয়ার গোল হলে নিজের কাজের স্বাধীনতা যেমন থাকে, তেমনি অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়। বাংলাদেশের মত দেশ, যেখানে ৪৭% শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বেকার, সেখানে উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টা করাটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

চাকরির আগেই ক্যারিয়ার হোক এর অভিজ্ঞতা
চাকরির আগেই সংশ্লিষ্ট ক্যারিয়ার শিক্ষা খুব জরুরি। এই কাজের সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। এতে এক সাথে দু’টো কাজ হয়, একে তো চাকরির জন্য রেজ্যুমে ভারি করার এক্সপেরিয়েন্স পাবেন, সাথে নির্বাচিত ক্যারিয়ার পথটি আসলেই আপনার জন্য কিনা তা বুঝতে পারবেন। কাজ করার মাধ্যমে বুঝতে পারবেন আপনি এ কাজে আনন্দ পাচ্ছেন কিনা। আনন্দ না পেলে, আনন্দ পান এমন কিছু খুঁজুন।

ক্যারিয়ার অথবা চাকরির জন্য নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই প্রস্তুত করার কয়েকটি উপায়।

পার্ট টাইম কাজ করা: পড়ালেখার পাশাপাশি পার্ট টাইম কাজ করুন। যে দিন থেকে কাজে নামবেন সে দিন থেকেই ক্যারিয়ার শুরু। এটা আজীবন আপনার মোট অভিজ্ঞতাকে বাড়িয়ে রাখবে। প্রতি ছুটিতে কোন প্রতিষ্ঠানে ফুলটাইমে কাজে নিযুক্ত হোন।

টাকা না, কাজ শিখতে প্রথমে কাজ করো: ক্যারিয়ার কি শুধু টাকার জন্য? উত্তর হ্যাঁ অথবা না দুটোই। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুতেই টাকার কথা মাথায় আনা যাবে না। কাজে আসবে, অথবা খুবই পছন্দের- এমন কাজ শিখুন। প্রথমেই টাকার কথা মাথায় না এনে কাজ করে দেখান। যে কাজই করবেন– পরিশ্রম করবেন, সততার ভালোবেসে করবেন, আর টাকার কথা মাথায় না এনে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে করবেন, তাহলেই ভালো ফল পাবেন।

পছন্দের ক্যারিয়ার নিয়ে পড়াশোনা করুন: ছাত্রজীবনে চাকরি করে অনেকে বিজনেসের লাইন ঘাট বের করে ফেলতে পারে, আপনিও তেমন করতে পারলে শিক্ষাজীবন শেষে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না। ট্রেনিং করা ও বই পড়াকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলুন। এখানে বিনিয়োগ যতো বাড়বে, ততো জীবন সহজ হয়ে যাবে।

এক্সেল, পাওয়ার পয়েন্ট, ইংরেজি বলতে ও লিখতে পারার দক্ষতাটুকু অবশ্যই থাকতে হবে। সেই সাথে আপনি যে ফিল্ডে কাজ করতে চান তার সাথে সম্পৃক্ত প্রশিক্ষণ করে নিজেকে এগিয়ে রাখতে পারেন।