গর্ভকালীন আলট্রাসনোগ্রামের গুরুত্ব

গর্ভকালীন সময়ে জরুরি ও করণীয় প্রথম ধাপ হচ্ছে আলট্রাসনোগ্রাম। আলট্রাসনোগ্রামই হচ্ছে প্রথম স্বর্গীয় অনুভূতি, যেখানে হবু মা তার সন্তানের প্রথম ধুকপুক (হার্টবিট) শুনতে পান, তার অিস্তত্বকে নিজ চোখে দেখতে পান। দুটি কোষের সমন্বয়ে গঠিত ভ্রূণ থেকে তৈরি হয় মানবসন্তান। ৯ মাস ৭ দিন মাতৃগর্ভে মায়ের শরীর থেকে খাবার খেয়ে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এই ভ্রূণ। এই পুরো প্রেগন্যান্সি পিরিয়ডটাকে চিকিৎসকরা চিকিৎসার সুবিধার্থে তিন ভাগে ভাগ করে থাকেন।

1st Trimester (প্রথম তিন মাস) 2nd Trimester (দ্বিতীয় তিন মাস) 3rd Trimester (শেষ তিন মাস)
প্রথম তিন মাস গর্ভবতী মায়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এ সময়টি হলো বীজ বপনের সময়। গর্ভে যথাযথ সময় এবং যথাযথ স্থানে ভ্রূণের প্রতিস্থাপন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে কোনো একটি ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলে হবু মা তার মাতৃত্ব হারাতে পারেন।

প্রথম তিন মাসে যেসব জটিলতা

হাইপার ইমেসি গ্রাভিডেরাম : গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস বমি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এই বমি যদি অতিরিক্ত পরিমাণে হয় তখন এ অবস্থাকে বলা হয় হাইপার ইমেসিস গ্রাডেরাম। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা এতই খারাপ হয় যে, হাসপাতালে ভর্তি করে স্যালাইন দিতে হয়। সে জন্যই অতিরিক্ত বমি হলে অবহেলা না করে সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

জরায়ুর বাইরে ভ্রূণের অবস্থান : জরায়ুর বাইরে ভ্রূণের প্রতিস্থাপন হওয়াকে ECTOPIC PRAGNANCY. বলে। জরায়ুর বাইরে কোনো কোনো জায়গায় এই প্রেগন্যান্সি হতে পারে? জরায়ুর দুই পাশে দুটি টিউব বা ওভারি– এসব জায়গায় ভ্রূণের প্রতিস্থাপন ঘটলে মারাত্মক দুর্ঘটনা হতে পারে। এমনকি জরায়ুর মুখে (Cervix) এবং Previous Cesarian Scar (জরায়ুতে পূর্বের সিজারের কাটা স্থানে যে মার্ক) থাকে সেখানেও এই ইকটপিক প্রেগন্যান্সি হতে পারে।

উপসর্গ : ইকটপিক প্রেগন্যান্সিতে স্বাভাবিক প্রেগন্যান্সির মতো পিরিয়ড বন্ধ থাকে। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে Spotting হতে পারে। বমি এবং মাথা ঘোরানোও তলপেটে তীব্র ব্যথা থাকবে। এই ব্যথাই হলো বিপদের পূর্বাভাস।

পরীক্ষা : খুব সাশ্রয়ী ও জনপ্রিয় পরীক্ষা আলট্রাসনোগ্রাম। আলট্রাসগ্রামের মাধ্যমেই রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা নেওয়া হয়।

গর্ভপাত : চিকিৎসারা Abortion-কে অনেক ভাগে ভাগ করেছেন। সব গর্ভপাতের প্রাথমিক উপসর্গ হলো তলপেটে ব্যথা ও রক্তক্ষরণ হওয়া।

পরীক্ষা কখন : আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমেই ডায়াগনোসিস করা সম্ভব গর্ভপাতের ধরন সম্পর্কে। যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময় গাইনোকলজিস্ট চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে কখনো ভ্রূণের হার্টবিট অনুপস্থিত থাকে, কখনো বা জরায়ুর ভেতর ভ্রূণ এবং রক্ত জমা থাকে আবার কখনো শুধু গর্ভফুলের কিছু অংশ রয়ে যায়। এসবই আলট্রাসনোগ্রাম নামক পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়।

ভ্রূণবিহীন প্রেগন্যান্সি : জরায়ুর ভেতর GESTATIONAL SAC (বাচ্চা থাকার থলি) তৈরি হবে কিন্তু কোনো ভ্রূণ সৃষ্টি হবে না।

উপসর্গ : নরমাল প্রেগন্যান্সির মতো উপসর্গ থাকবে, তবে অনেক ক্ষেত্রে প্রেগন্যান্সির ৮ সপ্তাহ পর হঠাৎ করে বিস্নডিং শুরু হতে পারে।

পরীক্ষা : আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে জানা যায়। এ ক্ষেত্রে থলির আকৃতি ও মাপ নির্ধারণ করে চিকিৎসক চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

মোলার প্রেগন্যান্সি : এই প্রেগন্যান্সি মতে, রোগীর জরায়ুতে ছোট ছোট আঙzরের মতো কোষ তৈরি হয়। এটা Further অস্বাভাবিক প্রেগন্যান্সি।

উপসর্গ : স্বাভাবিক প্রেগন্যান্সির মতো লক্ষণ থাকলেও পরবর্তী সময় বিস্নডিং হয়।

গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস এসব জটিলতাগুলো খুব বেশি হয়ে থাকে। প্রেগন্যান্সি যেমন খুব স্বাভাবিক শারীর বৃত্তীয় ঘটনা, ঠিক তেমনি গর্ভাবস্থার জটিলতাগুলো কিন্তু অস্বাভাবিক কিছু নয়।

খুব সাশ্রয়ী জনপ্রিয় সহজলভ্য একটি পরীক্ষা হলো আলট্রাসনোগ্রাম। দক্ষ চিকিৎসকের হাতে পরীক্ষা করানোর মাধ্যমে খুব সহজেই ঝুঁকিপূর্ণ প্রেগন্যান্সি ডায়াগনোসিস করা সম্ভব। প্রেগন্যান্সির ৬ সপ্তাহের মধ্যে প্রথম আলট্রাসাউন্ড করে জেনে নিন আপনার গর্ভে ভ্রূণের অিস্তত্ব সম্পর্কে, উপলব্ধি করুন ভ্রূণের উপস্থিতি এবং নিজ চোখে দেখে নিন আপনার গর্ভে প্রাণের সঞ্চার– কী এক আনন্দময় বিস্ময়কর অনুভূতি।

-ডা. সাজেদা রুমানা আহমেদ, কনসালট্যান্ট সনোলজিস্ট, চেম্বার : আলোক হেলথকেয়ার লি. কচুক্ষেত, মিরপুর, ঢাকা। ফোন-১০৬৭২