গুরুতর মানসিক রোগ : সিজোফ্রেনিয়া

ডা. শাইখ ইসমাইল আজহারি ||

সিজোফ্রেনিয়ার মূলত পাঁচটি কমন উপসর্গ রয়েছে। যার মধ্যে থেকে প্রথম ৩ টা উপসর্গ হচ্ছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত কিনা তা বুঝতে হলে তার মধ্যে নিন্মের উপসর্গ গুলি দেখেতে হবে। তার মধ্যে নিচের সিরিয়ালের ৫ টা উপসর্গের মধ্যে দুই বা দুইয়ের অধিক উপসর্গ থাকতে হবে। এমন কি সিরিয়ালের প্রথম ৩ টা উপসর্গের যে কোনো একটা থাকতে হবে এবং ব্যাপ্তিকাল হতে হবে ১ মাসের অধিক। প্রথম ৩ টা উপসর্গ হচ্ছে মূল উপসর্গ। নিচে উপসর্গসমূহ দেওয়া হলো-

১. ডিলিউসন : ডিলিউসন হচ্ছে এক প্রকার মিথ্যা বিশ্বাস যার বাস্তবতার সাথে কোনো মিল নেই। যেমন, কেউ এমন বিশ্বাস করে যে নিজে প্রধানমন্ত্রী কিংবা কোনো নায়িকা কিংবা কোনো হিরো তাকে ফলো করে। একে Persecutory delusion বলে। কিংবা সে বিশ্বাস করে তার চিন্তা অন্য জন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। একে বলে Delusion of Control যেমন কেউ বিশ্বাস করে রাতে আমার কাছে এমন কেউ আসে,আমি কি করবো সব সে ঠিক করে দেয় অর্থাৎ তার চিন্তাভাবনায় একটা মিথ্যা বিশ্বাস তৈরি হয় যা তার নিজের সম্পর্কে অন্যের সম্পর্কে বা সোসাইটি কিংবা পরিবারের কারো ব্যাপারে ভুল বিশ্বাস তৈরি করে। Delusion of Grandiose: তথা সে বিশ্বাস করে যে সে দেশের একজন বিশেষ কিছু। সবাই তার ভক্ত সে নিজকে নেতা হিসাবে বা আইডল হিসেবে বিশ্বাস করে। সে মনে করে কেউ এসে তাকে লন্ডন নিয়ে যাবে তার জন্য বিমান পাঠাবে কিংবা অন্য দেশের কেউ তার প্রতি পদক্ষেপ ফলো করে।

২. হ্যালুসিনেশন : এক্ষেত্রে তার মধ্যে অস্বাভাবিক সেন্স কিংবা উপলব্ধি তৈরি হবে। যার সাথে বাস্তবতার কোনো সমপর্ক নাই। যেমন সে নিজের কানে অনেক কিছু শুনতে পাবে অথচ বাস্তবে কেউ কথা বলছেনা। আবার সে গায়েবী আওয়াজ শুনতে পাবে। সে এসব শব্দের সাড়া দিবে কিংবা অদৃশ্য বস্ত দেখবে যার সাথে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।

৩. ডিসঅরিয়েন্টেড স্পিচ : মানে অসংলগ্ন কথাবার্তা। সে তার স্বাভাবিক কথাবার্তা বলার প্যাটার্ণ হারিয়ে ফেলবে। কখন কাকে কি বলতে হবে তা বুঝবেনা। কথা একবার একদিকে নিয়ে যাবে।এই ধরুন সে ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে সে তার বন্ধুদের কিংবা অন্যদের বলবে আগামী মাসে এখানে একটা ১০ তলা বাড়ি বানাবো। অমুক নায়িকাকে বিয়ে করবো। এমপি ইলেকশন করবো ইত্যাদি এবং সব কথায় সে সিরিয়াসনেস দেখাবে। সিজোফ্রেনিয়া হতে হলে উপরের এই ৩ টা থেকে যে কোনো একটা উপসর্গ থাকতে হবে সাথে নিম্নের এসব উপসর্গ থাকতে পারে।

৪. অসংলগ্ন আচরণ :  Aggressive behaviour তথা আক্রমণাত্বক আচরণ। নিজের সাথে কিংবা অন্যের সাথে কিংবা পরিবেশের সাথে। কেউ হয়তো নিজেকে আঘাত করে কেউ হয়তো অন্যকে আঘাত করে, কেউ গাছ গাছালি কাটতে থাকে, কেউ ঘরের জিনিসপত্র ভাংতে থাকে, আবার কেউ এমন কিছু করে না কিন্তু স্বাভাবিক মানুষের মত আচরণ করে না। যেমন ধরুন, খাবার খেতে বসেছে। কিছু নিজে খাচ্ছে, কিছু এক জায়গায় রেখে দিচ্ছে আর বলছে এইগুলি অমুকের জন্য বা এইগুলি জ্বিনের জন্য ইত্যাদি।

৫. নেগেটিভ আচরণ : রোগীর মধ্যে নেগেটিভ উপসর্গ তৈরি হয়। উদাহরণ স্বরুপ, সে কোনো আবেগ দেখাতে পারবে না, তার মধ্যে আবেগ অনুভতি, আনন্দ প্রকাশ, এই বিষয় গুলি হারিয়ে যাবে। মনে করুন তার কোনো আত্মীয় মারা গেলো এটা তার মাঝে প্রভাব বিস্তার করবে না এমনকি তাকে ব্যথিতও করবে না অথবা একটা সুখের কিংবা ভালো খবর শুনলে অন্যরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটা থাকবে না।ঘুম কমে যাবে সব কিছুতে ইন্টারেস্ট কমে যাবে, সেক্সুয়াল পাওয়ার কমে যাবে, সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা পছন্দ করবে। কিংবা নীরব স্বাভাবিক শান্ত হয়ে বসে থাকবে, কথাবার্তা কমিয়ে দিবে।

এই উপসর্গ সমূহ দেখা দেওয়ার পর অনেকে বুঝতে পারে যে আমার মানসিক কিছু সমস্যা হচ্ছে। আমার চিকিৎসা নেওয়া দরকার। যদি সে নিজের সমস্যা বুঝতে পারে, তাহলে তাকে নিউরোসিস বলা হয়। তার চিকিৎসার ফলাফল দ্রুত পাওয়া যায়৷ আবার অনেকেই আছে, যারা নিজেদের সমস্যা বুঝতে পারে না। কেউ যদি তাকে বুঝাতে চায় যে তোমার মানসিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসা নেওয়া দরকার, সে তখন আরো রাগ করে। এটাকে সাইকোসিস বলে। অর্থাৎ নিজের মানসিক সমস্যা হচ্ছে দেখেও যে তা বিশ্বাস করেনা, কিংবা বুঝতে পারেনা, তাহলে ওই অবস্থাকে সাইকোসিস বলা হয়।

সিজোফ্রেনিয়া বয়স সন্ধিকালের পর যে কোনো বয়সেই হতে পারে। স্টুডেন্টদেরও হতে পারে। আপনার পরিবারের অন্য কারো না থাকলেও এটা হতে পারে। আপনার সুস্থ মেধাবী সন্তানের কিংবা বন্ধু-বান্ধবীর এমন সমস্যা যদি আপনি বুঝতে পারেন তাহলে তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা না করে তাকে সময় দিন তার সাথে মন খুলে কথা বলুন তাকে সাপোর্ট দিন সে যেনো পূর্ণাঙ্গ পাগল না হয়ে যায়। আপনার সাপোর্ট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ভার্সিটিতে পড়ুয়া মেধাবী ছেলে মেয়েও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে তবে তারা নিজেদের সমস্যা বুঝতে পারে। অন্যরা পাগল ভাববে বলে শেয়ার করে না তবুও মাঝেমধ্যে কিছুটা তারা শেয়ার করে।

যখন দেখবেন আপনার আশেপাশের আপন কেউ হঠাৎ নীরব হয়ে গেলো কিংবা হঠাৎ তার আচরণ পরিবর্তন হতে শুরু করলো কিংবা তার থেকে হাঁসি আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে তখন তাকে একটু সাপোর্ট দিন। তার পিঠে হাত রেখে বলুন তোমার কি হয়েছে ভাইয়া। আমাকে খুলে বলো আপুকে খুলে বলো মা-বাবা একটু এগিয়ে আসুন। সন্তান কে জিজ্ঞাস করুন বাবা তুমি আমাদের সব কোনো ভয় পেয়োনা। আম্মুকে সব খুলে বলো কি হচ্ছে তোমার ভিতরে। মাথায় হাত বুলান, তাকে সাহস সঞ্চার করুন। বন্ধুরা তাকে একটু সাপোর্ট দিন। একটু উৎসাহিত করুন। তার ভালো লাগা না লাগা জানতে চেষ্টা করুন। এবং যত দ্রুত সম্ভব তাকে একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ছয় মাসের মধ্যেই সে আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে আশা করা যায় যদি সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়। অন্যথায় পূর্ণাঙ্গ মানসিক রোগী কিংবা আত্মহত্যার দিকে চলে যেতে পারে।

লেখক  : চিকিৎসক, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, সেন্টার ফর সাইকোট্রমাটোলজি এন্ড রিসার্চ বাংলাদেশ