জ্যঁ ক্যুয়ে: স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের জন্য বিমান ছিনতাই করেছেন যিনি

১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। রোদেলা আভাতে ভরপুর ফ্রান্সের প্যারিসের অর্লি বিমান বন্দর। রানওয়েতে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের ‘সিটি অব কুমিল্লা’ বিমান।১৭ যাত্রী ও ৬ জন ক্রু নিয়ে বিমানটি রোম ও কায়রো হয়ে করাচি বিমানবন্দরে যাবে। পথিমধ্যে অরলি বিমানবন্দর থেকে পাঁচজন যাত্রী তুলে নেবে বিমানটি। যাত্রীরা বিমানটিতে উঠলেন।

হঠাৎ বিমানবন্দরের রেডিও তারবার্তায় একটা বার্তা আসে। যা দেখে চক্ষু চড়কগাছ অপারেটরের। বার্তায় লেখা ছিল– ‘পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) স্বাধীনতাকামী যুদ্ধরত মানুষ বিশেষ করে ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী শরণার্থীদের সাহায্যার্থে কিছু ঔষধ ওই বিমানটিতে তুলে পাঠাতে হবে। না হলে বিমান উড়িয়ে দেয়া হবে’। বার্তা পাঠিয়েছিলেন জ্যঁ ক্যুয়ে।

তার পুরো নাম জ্যঁ ইউজিন পল ক্যুয়ে, একজন ফরাসি নাগরিক। ১৯৪৩ সালের ৫ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আলজেরীয় এক সৈনিকের সন্তান জ্যঁ ক্যুয়ে।

মূলত যাত্রী বেশে বিমানে উঠেন জ্যঁ। বিমানে উঠেই পকেট থেকে ৯এমএম পিস্তল বের করে বিমানের ইঞ্জিন বন্ধের নির্দেশ দেন তিনি। এই বিমানে করে যুদ্ধরত বাংলাদেশিদের ২০ টন ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানোর দাবি করেন তিনি। ওয়্যারলেসের মাধ্যমে জ্যঁ তার দাবি বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষে জানান।

এ বিষয় জেনে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সবাই হকচকিয়ে যান। ফ্রান্স সরকারের কর্তাব্যক্তিরা নড়েচড়ে বসেন। পরের দিনই জার্মানির চ্যান্সেলর ভিলি ব্রান্ডট প্যারিসে আসবেন ওই বিমানবন্দর হয়ে। তারা জ্যঁ– এর সঙ্গে যোগাযোগ করে আলাপ শুরু করেন। কিন্তু জ্যঁ তার দাবিতে অনড়।

ইতিমধ্যে বিমান ছিনতাইয়ের তথ্য সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। জ্যঁ রীতিমতো নায়কে পরিণত হন। জ্যঁ–এর পক্ষে সমর্থন জানিয়ে অনেকে অরলি বিমানবন্দরে ছুটে আসতে থাকেন। তাদের অনেককে আটক করে ফরাসি পুলিশ। এভাবে পেরিয়ে যায় আট ঘণ্টা। অবশেষে রাত আটটার দিকে রেডক্রসের কর্মীর ছদ্মবেশে ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ফরাসি পুলিশের সদস্যরা বিমানটিতে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। তারা কৌশল অবলম্বন করে জ্যঁ-কে আটক করেন।

আদালতে তোলা হয় জ্যঁ-কে। জ্যঁ–এর পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়তে মাঠে নামেন অঁন্দ্রে মারলো। আইনজীবীও নিয়োগ করেন। আদালত জ্যঁ-কে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। পরে মানবাধিকারকর্মীদের প্রবল চাপের মুখে ফরাসি সরকার সাজার মেয়াদ ৩ বছর কমিয়ে ১৯৭৩ সালে মুক্তি দেয় জ্যঁ-কে।জ্যঁ ক্যুয়েকে শাস্তি দিলেও ফরাসি সরকার জ্যঁ-এর দাবি মেনে নেয়। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর অঁদ্রে দ্য মল্টা নামের একটি সাহায্য সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে ২০ টন ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছিল দেশটি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে নানা দেশে জনমত গড়ে উঠেছিল। বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে সহায়তা করেছেন। তহবিল সংগ্রহ করেছেন। জনমত গঠন করেছেন। তাদের সবাইকে আমরা খুব বেশি মনে রাখিনি। কাউকে কাউকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অনেকেই স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। এমনই এক বিস্মৃত বিদেশি মুক্তিযোদ্ধার নাম জ্যঁ ক্যুয়ে।