‘তালিমুল ইসলাম’ গ্রন্থগারের জীবনকর্ম

মুযযাম্মিল হক উমায়ের

নাম: কেফায়াতুল্লাহ। পিতার নাম: ইনায়াতুল্লাহ। দিল্লির শাহজাহানপুরে তিনি আনুমানিক ১৮৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পুরো ভারতবর্ষে ‘মুফতি আজম’ উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন। হানাফি মাজহাবের অনেক বড়ো ফকিহ ছিলেন। তিনি ভারতবর্ষের রাজনীতি সংগঠন ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’ এর প্রথম সভাপতি ছিলেন। দারুল উলুম দেওবন্দে তিনি শিক্ষা সমাপন করেন। এছাড়াও তিনি জামিয়া কাসেমিয়া ও মাদরাসায়ে ইজাজিয়া শাহজাহানপুরেও পড়াশোনা করেছেন।

পাঁচ বছর বয়সে তিনি হাফিজ বরকতুল্লাহ এর মাধ্যমে মক্তবের শিক্ষাজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি পবিত্র কুরআনুল কারীম হিফজ সমাপ্ত করেন। এবং হজরত নাসিমুল্লাহের কাছ থেকে উর্দু ও ফারসির প্রাথমিক পড়াশোনা করেন।

তারপর তিনি মাদরাসায়ে আজিজিয়াতে ভর্তি হন। এবং ফারসি ভাষার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদি পড়া শুরু করেন। সেখানে তিনি আরবি কিতাবাদিও পড়েন। তারপর মুরাদাবাদের শাহি মসজিদে আরাবিয়া মাদরাসায় দুই বছর পড়াশোনা করেন।

তারপর তিনি ১৮৯৫ সালে দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধিমত্তার কারণে কম মেহনত করেও তিনি সহপাঠীদেরকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যান। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেন।

দেওবন্দে পড়াশোনা শেষ করে তিনি তাঁর পুরোনো উস্তাদ উবায়দুল হক রাহিমাহুল্লাহু তায়ালার মাদরাসায় পড়ানো শুরু করেন। নাজিমে তালিমাতসহ প্রশাসনিক কাজ আঞ্জাম দেন। এসব দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি বিভিন্নজন থেকে আসা শরয়ি মাসয়ালা—মাসায়িলের উত্তর প্রদান করতেন। প্রতিটি ফতোয়ার ক্ষেত্রে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ও নিখুঁততার পরিচয় দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি গোলাম আহমাদ কাদিয়ানিদের বিষয়ে মানুষকে সতর্ক করার জন্য ‘আল—বুরহান’ নামে একটি মাসিক সাময়িকী বের করতেন। কিন্তু সেখানে থাকাবস্থায় তিনি আর্থিক টানাপোড়েনে দিনাতিপাত করতেন। অবশেষে উস্তাদগণের পরামর্শে তিনি ‘মাদরাসায়ে আমিনিয়া’ তে হাদিস পড়ানো ও ফতোয়ার উত্তর প্রদানের কাজে যোগদান করেন। সেখানে তিনি মাসিক বিশ রুপি পেতেন।

১৩২৮ হিজরিতে তিনি ‘আঞ্জুমানে ইসলাহুল কালাম’ নামে একটি সমাবেশ শুরু করেন। এর উদ্দেশ্য ছিলো ছাত্রদেরকে বক্তৃতা ও বিতর্ক শাস্ত্রে পারদর্শী করে ওঠানো। প্রতি ৮ দিন পরপর প্রত্যেক ছাত্রই সেখানে বক্তৃতা দিতে হতো। বা পরস্পর বিতর্ক মজলিস করতে হবে। সেখানে তিনি তাদেরকে সহযোগিতা করবেন। তিনি এই কাজে সফল হয়েছিলেন। কিন্তু অবশেষে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের অভাবে সেই মজলিসটি আর টিকে থাকেনি।

তাঁর জীবনের দীর্ঘ ৫০ বছরে তিনি কয়েক হাজার ফতোয়ার উত্তর প্রদান করেছিলেন। তার ফিকহি মতামত দেশের অনেক বড়ো সম্পদ হিসাবে মনে করা হতো। একারণেই তিনি সাধারণ লোকদের পাশাপাশি আইন আদালতে কর্মকর্তাদের মধ্যেও বেশ খ্যাতিমান ছিলেন। তারা ধর্মীয় মামলায় তাঁর মতামতকেই প্রাধান্য দিয়ে রায় প্রদান করতেন।

তিনি ফতোয়া প্রদানের পাশাপাশি বেশ কিছু ধর্মীয় কিতাবও রচনা করেছিলেন। সেগুলো তখন প্রকাশও হয়েছিলো। কিন্তু বর্তমানে আর সেগুলোর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তবে বাচ্চাদের জন্য মাসয়ালা শিখার ধমীয় কিতাব ‘তালিমুল ইসলাম’ চার অংশে এটি বেশ সমাদৃত। উক্ত কিতাবটি দরসে নেজামির পাঠ্য কিতাব। সেই সময় থেকে আজো উক্ত কিতাবটি তাঁর গ্রহণযোগ্যতার স্থান দখল করে রেখেছে। প্রতিটি মাদরাসায় উক্ত কিতাবটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বাচ্চাদেরকে পড়ানো হয়ে থাকে।

তিনি সারা জীবন রাজনীতি ও বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও, জীবনের শেষসময়ে এসে তিনি এসব থেকে সরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমনকি জনসম্মুখে কোনো মন্তব্যও করতেন না। ইন্তেকালের কয়েক মাস আগে তিনি চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও গুরুতর যকৃত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। অবশেষে উক্ত অসুস্থতায় তিনি পৃথিবীর চিরঅমোঘ বিধান —এখান থেকে যেতে হবে— তাঁর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। তিনি ১৯৫২ সালে ৩১ ডিসেম্বর ৭৭ বছর বয়সে দিল্লীতে ইন্তেকাল করেন। দিল্লির মেহেরুলিতে শাহ কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকির মাকবারার নিকটে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর নামাজে জানাজায় ১ লক্ষ মানুষ একত্রিত হয়েছিলো।

লেখক: মুদাররিস, সংকলক, অনুবাদক।