তিন মিনিটের কবিতা: বহুমাত্রিক জগতে পৌঁছে দেয়

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘তিন মিনিটের কবিতা’ গুলো কবির নির্বাচিত নয়, বরং বলা যেতে পারে প্রাক অস্তিত্বশীল এই কবিতাগুলো আলোকিত হওয়ার জন্য, দীর্ঘ অন্ধকার পথ পরিভ্রমণের শেষপ্রান্তে এসে তাঁদের স্বপ্নের কবিকে খুঁজে পেয়েছে। কবিতাগুলো মনে করেছে দুলালই তাঁদের কাঙ্খিত ‘দি পোপ’ (The Pope) অথবা একমাত্র সাহিত্যিক স্বৈরাচারী (Dictator) নেতা; যিনি উপনিবেশ-উত্তর তাত্ত্বিক এবং জটিল (Implied reader) পাঠকের সঙ্গে তাঁদের এক টেবিলে বসাতে পারবেন।

বাংলা সাহিত্যের অ্যানথল্যাজি অনুমোদিত প্রধান ধারার কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ‘তিন মিনিটের কবিতা’ এই শিরোনামের নীচে নতুন লিটারারি জ্যেঁর (Literary genre) হিসাবে চল্লিশটি স্বল্প আয়তনের কবিতা জড়ো করেছেন।

শিরোনাম থেকে মনে হতে পারে, কবি শিক্ষানবীশ কবিতা পাঠকের পাঠ প্রক্রিয়া বা রিডিং পারফরমেনস্ উন্নত করার অভিপ্রায়ে হ্রাসকৃত মূল্যের রেশনের মতো, উনিশ শতকীয় ধাঁচের ম্যাট্রিক্যাল (Metrical) কবিতার ওয়ার্কশপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু তিন মিনিটের সন্নিবিষ্ট কবিতাগুলোর, যে কোন একটি কবিতার আপাত নিরীহ উদ্বোধনী পংক্তির পরের শব্দে প্রবেশ করার পরই, পাঠক বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করবেন; তাঁকে আসলে জুরাসিক পার্কের ডাইনোসরের সাথে ইনকাউনট্যার(Encounter) করতে হচ্ছে।তাঁর চোখের সামনে সাইনবোর্ড ঝুলে আছে নো ট্রেসপাসিং (No trespassing)। তাহলে তিন মিনিটের কবিতার সঙ্গে পাঠক তাঁর নিজের অস্তিত্বকে কীভাবে সনাক্ত করবেন? বস্তুতপক্ষে প্রশ্নটি আমরা উত্থাপন করতে পারি এভাবে।আরটিফিল ইন্টেলিজেনস্, আলেক্সা, কোয়ান্টাম সুপারপজিশন, সুপার মারিও গ্যালেক্সী-২ (ভিডিও গেম), আমেরিকান ড্রোন, নারী মাংসের পুঁজিবাদী রাজনীতি, উত্তর আধুনিক যৌন সংস্কৃতি, হিজাব, এই সব নতুন সামাজিক, রাজনৈতিক উপাত্তের একুশ শতকীয় পাশাপাশি, ফ্রানজ্ রোহ (Franz roh)-এর ম্যাজিক রিয়ালিজম, এলজো কারপেটিয়র (Alejo carperteier)- মারভেলাস রিয়ালিজম বা এন্ড্রে ব্রিটন(Andre Breton)-এর সুররিয়ালিজম কি এখন সাহিত্যের যাদুঘরে পরিণত হয়নি!

সম্ভবত এজন্যই তিন মিনিটের কবিতাগুলোয় সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, সুপার মার্কেটের সংলাপ, মাস মিডিয়ার ভাষা, মাস্টার বেড রুমের বরফ বিছানা, ড্রেসিং রুমের প্রসাধনী, বা ‘উনত্রিশটি চাঁদের’ মধ্যে একুশ শতকের কবিতার নতুন মেটাফর(Metaphor) নতুন ডিভাইস অন্বেষণ করেছেন।অন্যভাবে বললে এই অন্বেষণের মধ্য দিয়ে কবি, কবিতা বিশ্বের ব্যাকরণবাদী ‘কম্যুনিস্ট রোবট’ মোল্লাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সত্যিকারের মানুষ কবিদের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করেছেন।

এই কথা বলার অর্থ হলো ছোট অবয়বের কবিতা নির্মাণের যে প্রতিষ্ঠিত, রীতিসম্মত ডিভাইস রয়েছে যেমন, অ্যালেন গিনসবার্গ-এর (Allen Glnsberg) আমেরিকান সেনটেনস্ (American sentence), ল্যানডে (Landay আফগান রীতি) রনড্যু (Rondeau) বা এপিগ্রাম (Epigram), সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল বিধি সম্মতভাবে এই ডিভাইসগুলোর কোন একটিতে ব্যবহার করেননি। শব্দকে ক্লান্তিমুক্ত এবং কথা বলার শক্তি দেয়ার জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন কোলাজ (Collage), মন্তাজ(Montage) চলচিত্রিক ভঙ্গি (Pictorial Fragment) ফলে তিন মিনিটের কবিতাগুলোয় আমরা কোন ভয়েড স্পেস পাই না, বিশেষ করে সাউন্ডস্কেপ পদ্ধতি ব্যবহার করার কারণে শব্দের ইমেজ সাদা কাগজের শূন্য জায়গাগুলোয় দ্রুত ছড়িয়ে পরে।এই বিষয়টিকে আমরা বলতে পারি নতুন যুগের নতুন সাহিত্য ফ্যাশন।এবং এক্ষেত্রে নতুন লিরিকের জন্য সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল প্রায় স্বেচ্ছাচারী নায়কের মতো আমেরিকান সেনটেনস্, ল্যানডে, রনড্যু’র মিশ্র ডিভাইস প্রয়োগ করেছেন।কবি’র মেথডিক্যাল জাকসট্যাপজিশন (Methodical juxtaposition) শব্দের বিমূর্ত প্রতীকায়ন (Abstract symbolism) বিষয় থেকে আঙ্গিককে বিযুক্তকরণ (Decontextualization) এবং পুনরায় সংযুক্তকরণের (Recontextualization) এর দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া পাঠককে এক রূপক জ্যামেতিক চিত্র (Allegorical picaresque) নিয়ে যায়।

যেখানে পাঠক অতীত ইতিহাসের সংযোজিত পাঠ, বর্তমান এবং ভবিষ্যত সম্ভাব্য পাঠের এক প্যারাডক্সিক্যাল (Paradoxical) সহ অবস্থানের মধ্যে থেকে তাঁর নিজস্ব সংকট, ডায়স্ফোরা’র (Diaspora) মুখামুখি হন।এবং কবি তাঁর পাঠককে প্রস্তাব দেন, তিনি যেমন রেডিমেড রিসাইক্লিনিং (Recycling) সামাজিক উপাদান থেকে ডাটা সংগ্রহ করেছেন পুনর্বার রিসাইক্লিং করেছেন,তেমনি পাঠকও তাঁর সংকট, তাঁর শুষ্কতা রিসাইক্লিং করতে পারেন। একবিংশ শতাব্দীর জটিল জীবনে এই প্রক্রিয়া আমাদের স্বপ্ন, বাস্তব ম্যাজিকের এক ধারাবহিকতার মধ্যে জীবনের নতুন পাঠ গ্রহণ করতে সাহায্য করবে।এই সাহিত্যিক রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার উন্মোচন করতে গিয়ে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল যে লিটারারি ডিভাইস উপস্থাপন করেছেন,এই ডিভাইসটির নামকরণ করা যেতে পারে বাংলাদেশী আর্কিটাইপ।

তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো তিন মিনিটের কবিতার নেভিগেশন পাঠককে সংকট এবং ম্যাজিক স্বপ্নের যে বহুমাত্রিক জগতে পৌঁছে দেয়, সেখানে এই ছোট ছোট ফুলের মতো কবিতাগুলো পাঠককে একটাই কথা বলে- কথাটি খুবই পুরনো, পৃথিবী জন্মের সময় এই কথাটিই প্রথম শুনেছে আই লাভ ইউ। আমরা যে সমাজে বাস করি, যে রাজনীতির মধ্যে বাস করি, এই সমাজ, এই রাজনীতি কিন্তু আমাদের বলে না আই লাভ ইউ।