ধূমপান: একটি সামাজিক ব্যাধি, সুন্দর জীবনের অন্তরায়

হালিমা আক্তার

ধূমপান একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি, যা নিরবে ধ্বংস করছে আমাদের গোটা সমাজ। ধূমপানের ক্ষতিকর দিক আমরা সবাই কমবেশি জানি, একজন ধূমপায়ী নিজের স্বাস্থের অবনতি করা সহ আশেপাশের সবাইকে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে, হুমকির মুখে ফেলছে আমাদের জীবনকে।

ধূমপান কাকে বলে?
“Smoking refers to the inhalation and exhalation of fumes from burning tobacco in cigars, cigarettes and pipes- চুরুট, সিগারেট এবং পাইপের মাধ্যমে জ্বলন্ত ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সাথে টেনে নেওয়া এবং তা বের করে দেওয়ার প্রক্রিয়াকেই সাধারণত ধূমপান বলে”।

ধূমপান এর আসক্তি: ধূমপানে আসক্তির কারণ জিন। ধূমপানের প্রতি ধূমপায়ীদের আসক্তি, বিষন্নতাসহ শারীরিক আরও বেশকিছু রোগ-ব্যাধির সঙ্গে নিয়েনডারথাল (Neanderthal) নামে একটি জিন জড়িত বলে নিশ্চিত হয়েছেন আমেরিকার কয়েকজন বিজ্ঞানী। কেপরা বলেন, বংশগতভাবে এই জিন বিভিন্ন বৈশিষ্ট এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সরবরাহ করে। আর্টারি পুরু হয়ে যাওয়া, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা এমনকি নিকোটিনের প্রতি আসক্ত (ধূমপানে আসক্ত) হওয়ার বিষয়টি এই জিনের মাধ্যমে ঘটছে।

কিশোরদের আসক্তি: দেশের প্রায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে, গলির মোড়ে কিশোরদের হাতের নাগালেই বিক্রি হচ্ছে বিড়ি, সিগারেটসহ অন্যান্য তামাকজাত পণ্য। অর্থাৎ আমাদের সমাজে সিগারেট হলো সবচেয়ে সহজলভ্য জিনিস। এছাড়া দোকানে তামাকপণ্য বিক্রিতে করা হয় না বয়সের বাছ-বিচারও। আর এই সহজলভ্যতার কারণে এর প্রতি আগ্রহী হচ্ছে অপ্রাপ্ত কিশোরেরা। এছাড়া কিশোরদের এই আসক্তিকে আরো উৎসাহিত করছে প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রকাশ্য ধূমপান।

ধূমপানের ক্ষতিকর দিক: ধূমপানে বিশ্বে প্রতি বছর মারা যায় প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষ। ১৯৫০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই মারা গেছে প্রায় ছয় কোটি লোক। সিগারেটে থাকা নিকোটিন হিরোইন অপেক্ষা ক্ষতিকারী। একজন ধূমপায়ী নিশ্চিত জানে ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তারপরও সে তা পান করে। এটি অপমৃত্যু ঘটায়। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোটা পৃথিবীতে ধূমপানের কারণে যত বেশি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে, অন্য কোন রোগ-ব্যাধির কারণে তত ঘটে না। ধূমপান স্মরণশক্তি কমিয়ে দেয় এবং মনোবল দুর্বল করে দেয়।

শরীরের কী ক্ষতি করে: ধূমপানে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুস। এতে হার্ট অ্যাটাক, ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ, এমফাইসিমা, ও ক্যান্সার বিশেষত ফুসফুস, ল্যারিংস, মুখগহ্বর ও অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বৃদ্ধি পায়। এছাড়া রক্তনালিগুলো দুর্বল হয়ে যায় এবং তার রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। স্মরণশক্তি কমিয়ে দেয় এবং মনোবল দুর্বল হয় এর কারণে। ধূমপান ইন্দ্রিয় ক্ষমতা দুর্বল করে। ধূমপানের ফলে ঘ্রাণ নেয়া এবং স্বাদ গ্রহণের ক্ষমতা লোপ পায়। এছাড়া নিয়মিত ধূমপান পাকস্থলীর ক্ষত এবং যকৃৎ শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতিকর দিক
ধূমপান করা ব্যক্তিরা নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা তাঁরা হয়তো ভাবেন না। কিন্তু তারা অন্যদেরও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলেন। দেদারসে গণপরিবহন বা জমায়েতের স্থানে হরহামেশাই চলে ধূমপান। এতে ঝুঁকিতে পরেন অধূমপায়ী ব্যক্তি। পরোক্ষ ধূমপান আরো ক্ষতিকর দিক। কারণ একজন ধূমপায়ী শুধু নিকোটিন গ্রহণ করলেও তার ত্যাগ করা ধোয়ার সাথে তার বিষাক্ত ও ক্ষতিকর পদার্থ ধোয়ার সাথে মিলিয়ে ত্যাগ করে এবং আশেপাশে থাকা অধূমপায়ী ব্যক্তি নিঃশ্বাসের সাথে সেটা গ্রহণ করলে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রহস্থ হয়।সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকে চার হাজারের বেশি রাসায়নিক উপাদান, যার অন্তত ২৫০টিই ক্ষতিকর। পরোক্ষ ধূমপান কেবল স্বাস্থ্যগত বিষয়ই নয়, বরং এর সঙ্গে অন্যের ঝুঁকিও জড়িত বলে এটি নৈতিক এবং সামাজিক সমস্যা হিসেবেও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

ধূমপান থেকে উত্তরণের উপায়: কিভাবে ধূমপান ত্যাগ করা যায়? বা কিভাবে ধূমপান থেকে পরিত্রান পাওয়া যায় তার হয়তো কোন সুনির্দিষ্ট উপায় নেই। ধূমপান এমই এক অভ্যাস, যা থেকে বের হওয়ার কষ্ট সাধ্য। একজন ধূমপায়ী যখন বুঝতে পারে তখন সে তার এই পথ থেকে বের হওয়ার পথ খুজে পায় না। সে নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অন্যকেও ক্ষতির সম্মূখীন করছে, এটা সে বুঝতে পারলেও মারাত্মক আসক্তির কারণে সহজে বের হতে পারে না। ধূমপান ছাড়া কঠিন। তবে যারা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে তাদের জন্য ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা বেশ কিছু পরামর্শ।

১) শরীর নিকোটিনে অভ্যস্ত থাকার ফলে একটু সময় লাগে এই অভ্যাস মুক্ত হতে। সাধারণত দেখা যায়, শতকরা ৯০ ভাগ লোক ধূমপান ছাড়ার জন্য হঠাৎ করেই ধূমপান বন্ধ করে দেন। এভাবে ৫ থেকে ৭ শতাংশ লোক সফল হন। বাকিরা হতাশ হয়ে পুনরায় ধূমপান শুরু করেন। তাই হঠাৎ করে একবারে ছাড়ার চেষ্টা করবেন না। ধূমপান ত্যাগের সহজ উপায় হচ্ছে একটু সময় নেওয়া এবং সকলের সাহায্য নিয়ে ধূমপান ত্যাগের চেষ্টা।

২) আপনি কেন ধূমপান ছাড়তে চান সে বিষয়টি নির্ধারণ করুন। ধূমপান ছাড়ার কাল অনেক দীর্ঘ এবং যেকোনও সময় আবার আপনি ধূমপান শুরু করতে পারেন। তাই নিজের সংকল্পে অটুট থাকতে আপনার ধূমপান ছাড়ার কারণ অনেক সাহায্য করবে। ধূমপান ত্যাগের সহজ উপায় জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন।
৩) নিয়মিত শরীর চর্চার বা ব্যায়াম করলে ধূমপানের প্রতি চাহিদা কমে যায়। ধূমপান ছেড়ে দিতে হাঁটাহাঁটি বা অন্যান্য ব্যায়াম করা ধূমপান ত্যাগের সহজ উপায়।
৪) শাকসবজি এবং ফল খাওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। ধূমপানের সময় আপনার ডায়েট চললে সেটি এড়িয়ে চলুন কিছুদিনের জন্য।
৫) যেসব কর্মকাণ্ড আপনার ধূমপানের ইচ্ছা জাগায় সেগুলো থেকে দূরে থাকুন। মনে রাখবেন প্রথম কয়েক দিন খুবই কষ্টের। হতাশ বা নিরাশ হওয়া যাবে না।

শেষকথা
ধূমপানে বিষপান। ধূমপানের ফলে আপনি নিজের স্বাস্থ্যের অবনতি করাসহ আপনার আশেপাশের মানুষের জন্য হয়ে উঠছেন হুমকি স্বরূপ। সমাজে আপনি একজন ঘৃণিত ব্যক্তি এবং আপনাকে সমাজ সহ্য করতে পারে না একটা তিক্ত সত্য। সুন্দর পৃথিবীর জন্য আপনি অন্যতম অন্তরায়। তাই সিন্ধান্ত আপনার, ধূমপানের জন্য সমাজ, পরিবার, পৃথিবীর জন্য ঘৃণিত হবেন, নাকি ধূমপান ত্যাগ করে সুন্দর পৃথিবী গড়তে এগিয়ে আসবেন।

লেখক: বিএসএস দ্বিতীয় বর্ষ, সরকারি তোলারাম কলেজ, নারায়ণগঞ্জ
মেইল: moktasarker12345@gmail.com