নাটক নিয়ে ইউটিউব ও টিভির দ্বন্দ্ব

গত দশক থেকেই টিভি নাটকে তীব্র বাজেট স্বল্পতার কথা উঠে আসছে শোবিজে। এজন্য নাটকের মান ক্রমশ নিচের দিকে নামছে বলেও অনেকের দাবি। তবে দর্শক অনলাইন বিনোদনের দিকে ধীরে ধীরে ধাবিত হতে থাকলে নির্মাতারা নতুন আশার আলো দেখেন। টিভির পাশাপাশি নাটকের নতুন মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয়তা পায় ইউটিউব।

তাইতো কোনো কোনো প্রযোজক পরিচালক শুধু ইউটিউবের ওপর ভরসা করেই নাটক নির্মাণ করছেন এখন। তবে বেশিরভাগ নাটক টিভি ও ইউটিউব দু মাধ্যমেই দেখানো হয়। একটি নাটক নির্মাণের পর প্রথমে টিভিতে প্রচার হয়, তারপর তা ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত হয়। এর ফলে প্রযোজকরা দুই মাধ্যম থেকে আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন। সেই সাহসে তারা জনপ্রিয় কিছু তারকাকে দিয়ে ব্যয়বহুল নাটক নির্মাণ করে দারুণ সাড়া ফেলেছেন। কারণ তারা প্রথমে টিভি চ্যানেল থেকে লগ্নিকৃত কিছু টাকা তুলে আনতে সক্ষম হন। এরপর ইউটিউব থেকে তারা বাকি অর্থ তুলে লাভের মুখ দেখতে পান সহজে।

এই পরিস্থিতির সুযোগে কিছু জনপ্রিয় তারকা তাদের পারিশ্রমিক আগের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ বাড়িয়েছেন। প্রযোজকরাও লাভ খুঁজে পেয়েছেন বলে তারকাদের চাহিদামতো পারিশ্রমিক দিতে রাজি হয়েছেন। কিন্তু এবার দেখা গেল গ-গোল। টিভি চ্যানেলের অনেকেই বলছেন তারা আর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশের জন্য নির্মিত নাটক তাদের চ্যানেলে প্রচার করবে না। এতে ইউটিউবভিত্তিক নির্মাতারা আর্থিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবেন। স্বাভাবিকভাবেই তারা হয়ত আগের মতো তারকাদের আকাশচুম্বী পারিশ্রমিকের চাহিদা পূরণ করতে পারবেন না। তেমনি টিভি চ্যানেলগুলোকেও চাহিদা মেটাতে অনেক বেশি কনটেন্ট নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করতে হবে। আর টিভির বাজেট স্বল্পতার কথা তো অনেক আগে থেকেই সবার জানা। ফলে কম বাজেটে নাটক নির্মাণ করলে আবারও নাটকের মান নিম্নগামী হবে। এ বিষয়গুলোর সঙ্গে একমত টিভি চ্যানেল ও ইউটিউবভিত্তিক প্রযোজকরা।

বাংলাভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান তারেক আখন্দ বলেন, ‘আমরা সবসময় ভালো কনটেন্টের পক্ষে। বাইরের প্রযোজনা থেকে নাটকের টেলিভিশন স্বত্ব ক্রয় করার ব্যাপারে বাংলাভিশনই সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল। এর আগে সব টিভিতেই বাইরের নাটক প্রচার শুরু হয় টিভি রাইট নিয়ে। কারণ বাংলাভিশন সব সময় নিজস্ব কনটেন্টের প্রতিই জোর দেয়।

এখনো আমাদের পর্দার ৭০% কাজ নিজস্ব প্রযোজনায় তৈরি। বাকি কাজগুলো হয়ত কখনো শুধু টিভি স্বত্ব কিনে, কখনো টিভি ও যৌথভাবে ইউটিউব স্বত্ব কিনে আবার কখনো পুরো নাটকটিই কিনে প্রচার করেছি। তবে এখন যেহেতু ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করে টিভি চ্যানেল থেকে ইউটিউবভিত্তিক নাটক না প্রচারের একটা কথা শোনা যাচ্ছে, সেহেতু বলব আমরাও অন্য টিভি চ্যানেলের বাইরে নই। টিভি মালিক সমিতি কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমরা তা মেনেই কাজ করব। তার মানে এই নয় যে, কাল থেকেই ওই নাটকগুলো প্রচার বন্ধ করে দেব।’

চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান আমিরুল ইসলামও একই মত ব্যক্ত করলেন। তিনি আরও বলেন, ‘বিনোদন ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে যার যত কনটেন্ট যে তত ভালোভাবে টিকে থাকবে। সে দিকে বিবেচনা করেই আমরা নিজস্ব কটনেন্টের দিকে বেশি গুরুত্বারোপ করছি। এতে নেতিবাচক কিছু দেখি না।’

তবে এই সিদ্ধান্তে নেতিবাচক দিক দেখছেন ইউটিউবে অসংখ্য হিট নাটক উপহার দেওয়া ধ্রুব টিভির স্বত্বাধিকারী সংগীতশিল্পী ধ্রুব গুহ। তিনি বলেন, ‘আমরা বরাবরই শুনে এসেছি টিভি নাটকের বাজেট সংকট রয়েছে। তাই ভালো মানের নাটক নির্মাণ করা অনেকক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। এখন যদি তারা আবারও নিজস্ব প্রযোজনায় নাটক নির্মাণ বাড়াতে চায়, তাতে আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু সেই বাজেটে কতটা ভালো নাটক দর্শক দেখতে পাবেন তা নিয়ে কথা থেকে যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই আমরা যে যার ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখব।

তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যাতে সামগ্রিক ইন্ডাস্ট্রির অমঙ্গল হয়।’ এখন থেকে নিজেদের কাজের পরিকল্পনা নিয়ে ধ্রুব গুহ বললেন, ‘টিভি চ্যানেল যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তাতে আমার বা আমার মতো যারা ইউটিউবভিত্তিক কাজ করছেন তাদের কিছু বলার নেই। তারা এখন শুধু নাটকের টিভি রাইট পেয়ে সন্তুষ্ট নন। ইউটিউব স্বত্বতেও অংশীদারিত্ব চাচ্ছেন। কিন্তু সেভাবে তো আমাদের লগ্নিকৃত টাকা উঠে আসবে না। তাই আমরা যার যার মতো করে স্বাধীনভাবেই কাজ করতে চাই। এতে হয়ত আমাদেরও বাজেটে কিছুটা প্রভাব পড়বে। তবে আমরা চেষ্টা করব সাধ্যের মধ্যে যতটা সম্ভব ভালো মানের কনটেন্ট দর্শককে উপহার দিতে।’