নির্দোষ মিথ্যা বলে কিছু নেই

সাইফুল্লাহ বিন কাসিম

মানুষ সামাজিক জীব, সমাজেই তার বসবাস, সমাজ থেকে আলাদা হয়ে সে জীবনযাপন করতে পারে না। সমাজে চলতে গেলে একেবারে ঘরমুখো হয়েও থাকা যায় না। তাই মাঝেমধ্যে ভ্রমণে বের হতে হয়। সময়ে সময়ে বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের আড্ডায় উপস্থিত হতে হয়। আড্ডাকে আনন্দময় ও প্রাণবন্ত করার জন্য নানা রসাত্মক গল্প ও উপমা নতুন কিছু নয়। ওইসব যেমন শিক্ষণীয়, সত্যাশ্রয়ী ও উপভোগ্য হয় তেমনি এর অনেকগুলো হয় মিথ্যা, উদ্ভট ও বানোয়াট কল্পকাহিনী। সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে একেবারে উদাসীন। কেউ যদি কখনো এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তখন আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলা হয়, এটা নির্দোষ মিথ্যা। এ আর তেমন কিছু না এবং এতে গোনাহ হবে না।

আসলেই কি নির্দোষ মিথ্যা বলতে কিছু আছে? আসলেই কি এতে গোনাহ হবে না? অথচ মিথ্যা বলা এমন একটি স্বভাব, যা সব ধর্মবর্ণের মানুষের কাছে ঘৃণিত ও নিন্দিত। এমনকি যে মিথ্যা বলে স্বয়ং তার কাছেও ঘৃণিত ও অপছন্দনীয়। মিথ্যা বলার ভয়াবহতা সম্পর্কে কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, ‘মিথ্যা বলার জন্য তাদের রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি।’ সুরা বাকারা : ১০

হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তোমরা মিথ্যা পরিহার করো, কেননা মিথ্যা পাপের পথে পরিচালিত করে। আর পাপ মানুষকে জাহান্নামে পৌঁছে দেয়।’ সুনানে তিরমিজি : ১৯৭১

অন্য এক বর্ণনায় হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য। যারা কথা বলে এবং হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে। তার জন্য ধ্বংস, তার জন্য ধ্বংস।’ সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৯০

উল্লিখিত কোরআনের আয়াত ও হাদিসে মিথ্যার কোনো ভাগ করা হয়নি বরং সাধারণভাবে মিথ্যার শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। তাই নিজ থেকে মিথ্যাকে ভাগ করা চরম নির্বুদ্ধিতা, অজ্ঞতা ও হঠকারিতা বৈ কিছুই নয়।

আমাদের সমাজে আরেকটি সাধারণ প্রবণতা হলো বাবা-মা, ভাইবোন বা মুরব্বি শ্রেণির কেউ কেউ ছোট শিশুদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন বিষয়ে মিথ্যা বলে থাকে। যেমন ছোট শিশুকে কাছে ডাকার জন্য, বা তার থেকে কোনো জিনিস হাসিল করার জন্য বিভিন্ন জিনিসের প্রলোভন দিয়ে থাকে, অথচ বাস্তবে তাকে কিছুই দেবে না। এই যে ছোট শিশুদের সঙ্গে এমন প্রতারণার আচরণ করার মাধ্যমে তাদের শুভ্র ও কোমল হৃদয়ে আমরা কীসের বীজবপন করে দিলাম মিথ্যা ও প্রতারণার বীজ।

আমাদের কাছ থেকে তারা কী শিক্ষা পেল? তারা শিক্ষা পেল, এভাবে ধোঁকা ও প্রতারণা করা যায়। তারা যখন ধীরে ধীরে বড় হবে তখন মানুষের সঙ্গে তারাও মিথ্যা বলবে এবং প্রতারণা করবে। মানুষকে ধোঁকা দেবে, যা আমাদের থেকেই তারা শিখেছে। আর তাদের এ অপশিক্ষা পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য যে কত ভয়ংকর ও ক্ষতিকর তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এভাবে শিশুদের সঙ্গে মিথ্যা প্রতারণার ব্যাপারে হাদিসে ভয়াবহ শাস্তির কথা এসেছে।

হজরত আবদুল্লাহ বিন আমের (রা.) বলেন, একদিন হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের বাড়িতে বসা ছিলেন। এমতাবস্থায় আমার আম্মা আমাকে ডেকে বললেন। এদিকে এসো, তোমাকে একটি জিনিস দেব। হজরত রাসুল (সা.) বললেন, তুমি কি তাকে কিছু দিতে চাও? আমার আম্মা উত্তরে বললেন জি, আমি তাকে একটি খেজুর দিতে চাই! রাসুল (সা.) বললেন, যদি তাকে কিছু না দিতে তবে তোমার নামে একটি মিথ্যার গোনাহ লিখা হতো।’ সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৯১

অপর বর্ণনায় হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো শিশুকে ডাকল, এদিকে আসো! কিছু দেওয়ার জন্য অতঃপর তা দিল না, তবে তা মিথ্যা (প্রতারণা)।’ মুসনাদে আহমদ : ৯৮৩৬

এভাবে আমরা হাসি-ঠাট্টার ছলে অবলীলায় মিথ্যা বলে থাকি। অথচ হাদিসে মিথ্যাকে কবিরা গোনাহ সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং মিথ্যা বলাকে মুনাফিকের অন্যতম আলামত ও নিদর্শন বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি ১. যখন কথা বলে মিথ্যা বলে; ২. আমানত রাখলে খেয়ানত করে এবং ৩. প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করে।’ সহিহ বোখারি : ২৫৬২

পক্ষান্তরে মিথ্যা পরিহারকারীর ফজিলত ও পুরস্কার সম্পর্কে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমি তার জান্নাতের নিশ্চয়তা প্রদান করব। যে মিথ্যা পরিহার করবে এমনকি হাসির ছলে বলাটাও।’ সুনানে আবু দাউদ : ৪৮০০

তাই আসুন, আমরা মিথ্যা পরিহার করি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) -এর আদর্শের অনুসরণ করি। তিনিই সদা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।