নয়নাভিরাম বলখিয়া মসজিদ

ফিলিপাইন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। রাজধানীর নাম ম্যানিলা। ৭ হাজার ১০৭টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশটির আয়তন ২ লাখ ৯৯ হাজার ৭৬৪ বর্গকিলোমিটার। ফিলিপাইনের জনসংখ্যা ১০ কোটির ওপরে। ফিলিপাইনের দ্য ন্যাশনাল মুসলিম অব কমিশনের হিসাবমতে, মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ১৪ শতাংশ। এশিয়ায় যে দুটি দেশে ক্যাথলিকেরা সংখ্যাগুরু ফিলিপাইন তার অন্যতম।

ফিলিপাইনে ইসলামের প্রচার-প্রসার হয়েছে আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। তাদের জীবনযাত্রা ও আখলাক-চরিত্র দেখে ফিলিপাইনের আধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়। রাজধানী ম্যানিলাসহ বিভিন্ন দ্বীপে অনেক নয়নাভিরাম ও ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে। শেখ করিম আল মাখদুম মসজিদটি ফিলিপাইনের প্রথম মসজিদ। যা মিন্দানাওয়ের সিমুনুল প্রদেশের তুবিগ ইন্দানগানে অবস্থিত। শেখ মখদুম করিম নামে এক আরব ব্যবসায়ী ১৩৮০ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

ফিলিপাইনে আড়াই হাজারের মতো মসজিদ রয়েছে। প্রায় সবগুলো মসজিদে সহিহ-শুদ্ধভাবে কোরআন শিক্ষা, অমুসলিমদের ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ, লাশ গোসল করানো, কনফারেন্স কক্ষ ও হেফজ মাদ্রাসার সমন্বয়ে একটি করে ইসলামিক সেন্টার রয়েছে। ফিলিপাইনের মসজিদগুলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তাদের গর্বের বিষয়। মসজিদ ছাড়াও প্রায় ১২০টির মতো ইসলামি শিক্ষা কেন্দ্র, প্রচুর দাতব্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

ফিলিপাইনে শুক্রবার কর্মদিবস হলেও মুসলমানরা দুপুরের খাবারের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া জুমার নামাজের জন্য অতিরিক্ত এক ঘণ্টা ছুটি পান। প্রতি বছর ৬ হাজারের মতো মুসলমান হজপালনের জন্য সৌদি আরব গমন করেন। দেশটিতে দাওয়াতে তাবলিগের কাজ চলে, টঙ্গীতে অনুষ্ঠিত বিশ^ ইজতেমায় কয়েকশ’ ফিলিপাইনি মুসলিম অংশ নেন নিয়মিত। ফিলিপাইনের মুসলমানদের অধিকাংশ মিন্দানাও, পালাউন ও মোরোতে বসবাস করেন। কয়েক বছর ধরে ফিলিপাইনে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি দেওয়া হয়। দেশটিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে হালাল খাবারের দোকান। মুসলমানরা তাদের ঐতিহ্য বজায় রেখে রমজান পালন করেন। তারাবির নামাজে খতমে কোরআনের ব্যবস্থা হয় অনেক মসজিদে। এবার প্রায় চৌদ্দ ঘণ্টা রোজা পালন করবেন ফিলিপাইনবাসী।

ফিলিপাইনের সবচেয়ে বড় মসজিদ সুলতান হাজি হাসান আল বলখিয়া মসজিদ। এটি বলখিয়া মসজিদ কিংবা কোটাবাটো গ্র্যান্ড মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদটিকে সাজানো প্রাসাদ মনে হয়। ফিলিপাইনে নতুন গড়ে ওঠা কোটাবাটো শহরে মসজিদটি অবস্থিত। ফিলিপাইনের মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও উৎসাহ দেওয়ার লক্ষে ব্রুনাইয়ের সুলতান হাসান আল বলখিয়া ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয়ে মসজিদটি নির্মাণ করে দিয়েছেন।

কারুকাজ আর স্থাপত্যশৈলী এ মসজিদের বৈশিষ্ট্য নয়। এসবের পরিবর্তে সাধারণত্বেও মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এ মসজিদের সৌন্দর্য আর প্রবল আকর্ষণের কারণ। দামি জিনিসপত্র ব্যবহার, কারুকাজ আর জটিল নির্মাণশৈলী ছাড়াও যেকোনো স্থাপনা আকর্ষণীয় আর মনোরম হতে পারে তার সাক্ষ্য বহন করছে ফিলিপাইনের এ মসজিদ। মসজিদের সাধারণ নির্মাণশৈলীর আর চারপাশের মনোরম পরিবেশ একে দান করেছে অপরূপ সৌন্দর্য আর মাধুর্য। মসজিদের তিন দিকে নয়নাভিরাম জলাধার, এক দিকে পাহাড় শ্রেণি, বৃক্ষরাজি ঘেরা বিশাল উদ্যান এবং অদূরে বিশাল সাগরের নীল জলরাশি সব কিছু এ মসজিদের পুরো পরিবেশকে করে তুলেছে স্ব^র্গীয়। কখনো কখনো মনে হয় যেন মসজিদ নয় বরং স্বর্গীয় কোনো পরিবেশে সাজানো এক অপরূপ রাজপ্রাসাদ এটি।

প্রাচীন আর আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে নির্মিত দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদ। ২০১১ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। একসঙ্গে ৬০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন এ মসজিদে। চারটি মিনার, ১৪টি গম্বুজ রয়েছে এ মসজিদে। গম্বুজের সোনালি রং মন কাড়ে দর্শকদের। সুলতান বলখিয়া মসজিদ আর এর চারপাশের মনোরম পরিবেশের কারণে এ এলাকা এখন কোটাবাটো নগরবাসীর অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। শুধু মুসলমান নয় অমুসলিম পর্যটকরাও এ মসজিদ দেখতে ভিড় করেন।

ফিলিপাইনের আরেকটি বিখ্যাত মসজিদের নাম পিঙ্ক মসজিদ। মসজিদটিকে শান্তি এবং ভালোবাসার রঙে সাজানো হয়েছে। ফিলিপাইনের মগুইন্দানো প্রদেশের দাতুসৌদি আম্পাতাউন শহরে মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদের বর্ণিল রং একে অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনা থেকে আকর্ষণীয় এবং ব্যতিক্রম হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে, দিয়েছে আলাদা বৈচিত্র্যময়তা।

ম্যানিলার গোল্ডেন মসজিদও ঐতিহাসিক একটি মসজিদ। দানসালান বাতো মসজিদ ও মারাভি গ্র্যান্ড মসজিদও উল্লেখযোগ্য মসজিদ। দানসালান বাতো মসজিদটি মুসলিম অধ্যুষিত মিন্দানাও দ্বীপের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ।