বাংলা ভাষা-আমার গর্ব, আমার ভালোবাসা

সেলিম জাহান||

কখনো প্রশস্তি, কখনো বিস্ময় এবং কখনো প্রশ্নের দিক থেকে এসেছে বিষয়টি। ‘এমন সাবলীল এবং শুদ্ধ বাংলায় পুরো বক্তৃতা উপস্হাপন করলেন আপনি’! কিংবা ‘পুরো একঘন্টার বলায় একটিও ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করলেন না’! অথবা, ‘অর্থনীতিবিদ হয়ে এ রকম সুন্দর সাহিত্যের বাংলা আপনি কেমন করে শিখলেন?’

প্রতিক্রিয়ার রকমফের যাই হোক না কেন, মূল অনুসন্ধিৎসা হচ্ছে বক্তৃতা বা লেখা কেমন করে পুরোপুরি ইংরেজীবর্জিত বাংলা ভাষায় করছি। প্রশস্তি, বিস্ময় কিংবা প্রশ্নের পেছনে ওৎসুক্যের একটি মূল কারন: দীর্ঘদিন ধরে স্বদেশের বাইরে অবস্হান সত্বেও বাংলা ভাষার স্বচ্ছন্দ ব্যবহার। প্রশস্তিগুলো বিনম্রভাবে গ্রহন করি। বিস্ময়টিও প্রশস্তিরই সমার্থক। তবে তারাও তো একধরণের জিজ্ঞাসা বটে। আর তার সঙ্গে সরাসরি প্রশ্ন তো আছেই।

প্রত্যেকটি ভাষারই একটা নিজস্ব প্রান, স্বত্ত্বা ও শক্তি আছে। বাংলা ভাষাও তার ব্যতয় নয়। বাংলা শুধু আবেগের ভাষা নয়, বেগের ভাষাও বটে। শৈশব ও কৈশোরে বাংলা বই ও পত্র-পত্রিকা পড়ে বাংলা ভাষার প্রান, স্বত্ত্বা ও শক্তির সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে। পড়তাম প্রচুর এবং পড়ার সে স্বাধীনতার ক্ষেত্রটি পারিবারিক পরিবেশই তৈরী করে দিয়েছিল। মনে আছে, মায়ের বইয়ের ট্রাঙ্কের সব শরৎচন্দ্র পড়ে যখন শেষ করেছি, তখন আমার বয়স ১২ ছাড়ায় নি। সেই বয়সেই এক বিকেলে ‘বিপ্রদাস’ পড়ে শেষ করেছিলাম। অনেক কিছুই বুঝি নি – দ্বাদশবর্ষীয় এক বালকের পক্ষে সেটাই তো স্বাভাবিক। তবে বিপ্রদাস, দ্বিজদাস ও বন্দনার সম্পর্কের এক যে সূক্ষ্ম সুপ্ত মাত্রিকতা আছে, তা কিন্তু সে বয়সেই ধরতে পেরেছিলাম।

চতুর্থ শ্রেনীতে থাকতেই বরিশাল জিলা স্কুলের বার্ষিক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দশম শ্রেনীর ছাত্রদের পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছিলাম। পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ার সময়ে এক সহপাঠীর সঙ্গে মিলে একটি রহস্য উপন্যাসের পাঁচ পরিচ্ছেদ লিখেছিলাম। তার বাবা বদলি হয়ে যাওয়ায় সে প্রচেষ্টা অসমাপ্তই থেকে যায়। সপ্তম শ্রেনীতে থাকতে প্রথম লিখলাম স্কুলের বার্ষিক ম্যাগজিন ‘সবুজ পাতায়’। এ ছাড়া শিক্ষকদের বদলির সময়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি পত্র আমাকেই লিখতে হতো।

এ সব কিছুই আমার জন্য বাংলা ভাষার একটি শক্ত ভিত্তিভূমি তৈরী করার প্রয়াসে সাহায্য করেছিল। কলেজ জীবনে এ ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছিলাম সযত্নে। বলে নেয়া ভালো যে সব প্রচেষ্টায় কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অত্যন্ত বিনম্রভাবে বলি যে স্কুল বা কলেজের কোন পর্যায়ের কোন পরীক্ষায়ই দুটো বিষয়ে কেউ কখনো আমাকে হারাতে পারেনি – একটি বাংলা, অন্যটি সমাজপাঠ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বাংলা পঠন ও ব্যবহারের দিগন্ত প্রসারিত হয়েছিল। একদিকে এপার বাংলা-ওপার বাংলার বিভিন্ন লেখকের বই – গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ – গোগ্রাসে গিলেছি। ‘দেশ’ পত্রিকা পড়তে শুরু করি সে সময়ে। নিউমার্কেটে বইয়ের দোকানগুলো – মল্লিক ব্রাদার্স, ওয়ার্সী বুক সেন্টার, নলেজ হোম, মহিউদ্দীন এন্ড সনস; স্টেডিয়ামের ম্যারিয়টা, বাংলা বাজারের বইয়ের দোকানগুলোতে আমার ছিল নিত্য আনাগোনা। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিতর্কের শুরুতো আমাদের দিয়েই। বিজয়ী হয়েছি আন্ত:হল ও আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায়। শানিত করেছি বাংলায় বলার অভ্যেস।

আশির দশকে তিনটে জিনিস আমার বাংলা চর্চাকে বেগবান করেছে। প্রথমত: রেডিও ও টেলিভিশনে নিজস্ব অনুষ্ঠান ও উপস্হাপনা বাংলায় সাবলীল বলাকে সামনে নিয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত: শিক্ষকতা বহু শক্ত ও প্রায়োগিক শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ উদ্ভাবন করতে সাহায্য করেছে। তৃতীয়ত: পত্র-পত্রিকায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে লেখার ফলে বাংলা লেখার ক্ষেত্রে সাবলীলতা এসেছে।


মোদ্দা কথা হচ্ছে – বাংলা ভাষার প্রতি অঙ্গীকার, চর্চা ও মমতাই বাংলায় বলা ও লেখার ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে আমাকে প্রতিনিয়ত সাহায্য করেছে। একটি সচেতন প্রয়াস নিয়ে আমি বাংলা ব্যবহারে ব্রতী হয়েছি এবং অবিরত সে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় এবং কর্মক্ষেত্রে ও দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ব্যবহারের সুযোগ আমার কম। সেজন্যই নির্ভুল বাংলায় বক্তব্য উপস্হাপনার ক্ষেত্রে আমি আরও যত্নবান হই সতত:। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত চেষ্টা করি নতুন নতুন বাংলা প্রতিশব্দ বার করতে এবং সেটাকে জনপ্রিয় করতে।

সর্বসময়ে মনে রাখি যে বাংলা ভাষাই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছে। আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’ যখনই যেখানে শুনি শিহরিত হই। মাতৃভাষার জন্য শহীদ হওয়ার এরকম দৃষ্টান্ত আর নেই। ‘আমি কি সে কথা ভুলিতে পারি’? সেই চেতনাই তো আমাকে প্রতি ক্ষনে, প্রতি পলে উদ্বুদ্ধ করে আমার হৃদয়ের ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করতে, কারন চূড়ান্ত বিচারে সেটাই আমার প্রতিজ্ঞা, আমার ভালবাসা, আমার গর্ব।

লেখক : খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ