বুক রিভিউ যেভাবে লিখবেন

অনিন্দিতা চৌধুরী 

পাঠের পরও থেকে যায় পাঠের রেশ। একটি বই পড়ার পর তা নিয়ে ‘জাবর কাটা’ বইপ্রেমীদের অন্যতম পছন্দের কাজ। বইয়ের রিভিউ লেখা এই ‘জাবর কাটা’র ভালো একটি উপায়। এতে করে নিজের বিশ্লেষণ যেমন উপস্থাপন করা যায়, তেমনি অন্যকে বইটি সম্পর্কে জানানও দেওয়া যায়।

লেখক যখন বই লিখেন, তখন তা তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও বিশেষত তার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে লিখেন। এরপর একজন পাঠক যখন একজন বই পর্যালোচনাকারী তথা রিভিউয়ারের স্থানে যান, তখন সেই রচনাতে বই লেখকের মনস্তাত্ত্বিক ছাপের চাইতে বেশি প্রবল হয় রিভিউ লেখকের চিন্তা-ভাবনা। তবে সেটুকু যেন বস্তুনিষ্ঠতাকে ছাড়িয়ে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে রচিত হলেও সরাসরি ব্যক্তিগত মতামত, যেমন– ‘আমার মনে হয়’, ‘আমার প্রিয় বই’, ‘আমার ভালো লাগেনি বা লেগেছে’ ইত্যাদি বাক্য এড়িয়ে চলা দরকার।

অন্য যেকোনো লেখার মতো রিভিউ লেখাতেও থাকবে একটি আকর্ষণীয় শিরোনাম ও ভূমিকা। শিরোনামে বইয়ের নাম রাখলে পাঠকের জন্য সুবিধা হয়। শিরোনামের পর আসে লেখার প্রাথমিক তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ভূমিকা বা সূচনা। এর ইংরেজি পরিভাষা ‘ইন্ট্রোডাকশন’কে ছোট করে বলা হয় ইন্ট্রো। এই ইন্ট্রো হবে সংক্ষিপ্ত, বাহুল্যবর্জিত এবং অবশ্যই চিত্তাকর্ষক।

ইন্ট্রো পড়ে পাঠক যেন পুরোটি লেখা পড়ার আগ্রহ বোধ করেন। তাই ছোট এই অংশের ওপর দায়িত্বটা কিন্তু বেশ বড়সড়। তবে কখনো কখনো এমন হয় যে, লেখাটা শুরুই হচ্ছে না, এমনিতে বাকি অংশ সব গোছানো। তখন ওটুকু লেখার জন্য আটকে না থেকে পুরোটা লেখা শেষ করার পর সুবিধামতো ইন্ট্রো লিখে নেওয়া যায়।

এরপর তুলে ধরতে হয় বইটির কাহিনী সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। এক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত পরিসর সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ অনেক সময় রিভিউর মধ্যে কাহিনীর অতি প্রাধান্য চলে আসে, যা লেখাকে একঘেয়ে করে তোলে। একজন রিভিউ লেখককে সবসময় মনে রাখতে হবে যে তিনি আসলে বই সম্পর্কে আলোচনা করতে এসেছেন, বইয়ের পুরোটা কাহিনী জানিয়ে দিতে নয়।

কাহিনীর বইটির পটভূমি বা প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা দরকার। একটি নির্দিষ্ট সময়, সমাজব্যবস্থা বা সংস্কৃতিকে ঘিরে লেখা হতে পারে ফিকশন-নন-ফিকশন সব ধরনের বই-ই। মূলত রচনার পেছনের গল্পটা থাকে এই প্রেক্ষাপটের মধ্যে। তাই রিভিউতে তা উল্লেখ করা এবং বইয়ের সঙ্গে সেটিকে সম্পর্কযুক্ত করার দায়িত্বও রিভিউ লেখকের।

কোনো বইয়ের রাজনৈতিক পটভূমি থাকতে পারে, কোনোটার বা নিছক ইতিহাস, কোনোটা হয়তো একেবারে ব্যক্তি পর্যায়ের আবেগ-অনুভূতি নিয়ে লেখা। প্রেক্ষাপট অনেক ক্ষেত্রে ঠিক করে দেয় বইটির ধরন। আর একজন উৎসুক পাঠক একটি বই সম্পর্কে প্রথমেই যে বিষয়টি জানতে চান, তা হচ্ছে এর জনরা বা ঘরানা। সব পাঠকের সব ধরনের বই পছন্দ নাই হতে পারে, তাই আগে থেকে রিভিউতে চোখ বুলিয়ে এর ধরন সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা নেওয়ার বিষয় থাকে। রিভিউ লেখককে সেই দিকটিতে নজর দিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাখ্যার পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ বা সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনা তুলে আনা যায়।

এর পরের ধাপটি রিভিউর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে আলোচনা হবে বইটির ভালো দিক, মন্দ দিক এবং কী করলে ভালো করা যেত সেই দিকটি। এই ৩ দিকের মধ্যে সামঞ্জস্য ধরে রাখা জরুরি। যখন খারাপ দিক বলা হচ্ছে, ভাষার ক্ষেত্রে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যখন ভালো দিক বলা হচ্ছে, তখন বিভিন্ন বিশেষণের আতিশয্যে হারিয়ে যাওয়া যাবে না। সর্বোপরি একটা পরিমিত মাত্রা ধরে রাখাটাই রিভিউর মূলমন্ত্র। কোন ঘরানাপ্রেমীরা সেটি পছন্দ করবেন, সেটি বলে দিলে পাঠকদের জন্য বই পছন্দ করতে সুবিধা হয়। তবে মন্দটা বলতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, বই রিভিউর ক্ষেত্রে সর্বোপরি গঠনমূলক সমালোচনাই কাম্য।

এ ছাড়া রিভিউতে যোগ করা যায় বই লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য। তবে এখানেও একই বিষয়, সব তথ্য দিতে হবে না। মৌলিক তথ্যের পাশাপাশি রিভিউ করা বইটি লেখা বা প্রকাশের সময়ের লেখকের নিজের কিছু অভিজ্ঞতা যোগ করে দিলে বিশেষ মাত্রা যোগ হবে।

উদ্ধৃতি যোগের বিষয়টি অত্যাবশ্যকীয় নাহলেও রাখা যেতে পারে। এটি সবসময়ই যেকোনো লেখাকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। উদ্ধৃতির মাধ্যমে যেন একটি লেখায় ‘হিউম্যান ফেস’ আসে। যখন ন্যারেশন বা বর্ণনা হিসেবে আমরা কিছু পড়ি, তার চাইতে বেশি মনোযোগ কেড়ে নেয় কোনো চরিত্রের সংলাপ বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির উদ্ধৃতি।

ঠিক এ কারণেই রিভিউতেও বইটিতে থাকা অথবা বইটি নিয়ে কোনো চুম্বক উদ্ধৃতি বা সংলাপ যোগ করে দিতে পারেন। এতে করে লেখার একঘেয়েমিও কিছুটা কেটে যাবে এবং পাঠক বইটি পড়তে আরো বেশি আগ্রহী হবেন। তবে ১ বা ২টির বেশি উক্তি অথবা দীর্ঘ উক্তি বর্জন করাই ভালো। এক্ষেত্রে জনপ্রিয়তাভিত্তিক ফর্মুলা যোগ করা যায়। যেমন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কপালকুণ্ডলা’ বইটির রিভিউ লিখতে গেলে সেই বিখ্যাত সংলাপ ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ?’ জুড়ে দেওয়া যায়।

যত কথাই আমরা বলি না কেন, শেষ কথাটা বলতেই হয়। বই রিভিউর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। পুরোটা রিভিউ শেষ হলেও এই জায়গাটির জন্য অন্তত কয়েক লাইন বরাদ্দ রাখতে হবে। এটা হতে পারে বইটি কাদের পড়া জরুরি, কোন ঘরানার সাহিত্যপ্রেমীরা এটি পড়তে পছন্দ করবেন বা হতে পারে বইটি পড়া কতটা উপভোগ্য হবে, সে বিষয়ে নিশ্চয়তা বা নিছক অনুরোধ। এটা পুরোটাই নির্ভর করছে রিভিউ লেখকের ওপর।

সূত্র: দ্যা ডেইলি স্টার