যেসব কাজ করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি মেলে

এক হাদিসে আছে, সাহাবি হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, ‘আমি এবং আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলাম, তখন মসজিদের দরজার কাছে এক ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে। তখন সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! কেয়ামত কবে হবে? হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এর জন্য তুমি কি প্রস্তুতি নিয়েছ? এ প্রশ্ন শুনে লোকটি যেন একটু দুর্বল হয়ে গেল। অতঃপর সে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! সে দিনের জন্য আমি বেশি নামাজ, রোজা ও সদকার প্রস্তুতি নিতে পারিনি। কিন্তু আমি নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.) কে ভালোবাসি। তিনি বললেন, তাহলে তুমি যাকে ভালোবাস (কেয়ামতের দিন) তার সঙ্গে থাকবে। হজরত আনাস (রা.) বলেন, তাহলে তুমি যাকে ভালোবাস (কেয়ামতের দিন) তার সঙ্গে থাকবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এই কথাটিতে আমরা যেরুপ খুশি হয়েছিলাম ইসলাম গ্রহণের পর অন্য কিছুতে এরুপ খুশি হইনি।’ –সহিহ বোখারি

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুম (রাহ.) আল্লাহর ভালোবাসা সম্পর্কে বলেন, ‘এটি এমন একটি মর্যাদা যা লাভের আশায় প্রতিযোগীরা প্রতিযোগীতা করে থাকে, আর নেক আমল যারা করতে চায় তারা সদা সচেষ্ট থাকে। পূর্ববর্তীগণ এর জ্ঞানার্জনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন, আর প্রেমিকরা এর জন্য সবকিছু বিলিয়ে দিয়েছেন।’

যে আল্লাহকে মহব্বতকারীর মর্যাদা থেকে আল্লাহর মাহবুব (প্রিয়) হওয়ার মর্যাদায় উন্নীত হতে চায়, তার জন্য ইমাম ইবনুল কাইয়্যুম (রহ.) তার প্রসিদ্ধ কিতাব ‘মাদারিজুস সালিকিন’ এ সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ এমন দশটি আমলের কথা উল্লেখ করেছেন- যেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি মেলে।

পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত

কোরআন তেলাওয়াত অত্যন্ত বরকতময় একটি আমল। ভালো হয় কোরআন অর্থ-তাফসিরসহ বুঝে-শুনে তেলাওয়াত করা। না হলেও সওয়াব মিলবে। হজরত হাসান ইবনে আলী (রা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তীগণ কোরআনকে তাদের রবের পক্ষ থেকে পত্রাদি ভেবেছিলেন। ফলে তারা রাতেরবেলায় এগুলোকে গভীরভাবে মনোনিবেশসহ তেলাওয়াত করতেন আর দিনের বেলায় এর অন্তর্নিহিত অর্থ তালাশ করতেন।’

ফরজের পাশাপাশি নফলকে গুরুত্ব দেওয়া

ফরজ ইবাদত আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। হাদিসে কুদসিতে আছে, ‘যে আমার অলির (বন্ধুর) সঙ্গে শত্রুতাপোষণ করে আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা দিয়ে থাকি। আমার বান্দা তার ওপর ফরজকৃত কার্যাবলী ভিন্ন অন্য কাজ দিয়ে আমার ভালোবাসা অর্জন করতে পারে না। অর্থাৎ আল্লাহর মহব্বত হাসিলের প্রধান উপায় হলো- ফরজ আদায়। আর আমার বান্দা নফল কার্যাবলীর মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভে সচেষ্ট থাকে, শেষ পর্যন্ত আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। অতঃপর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শুনে, আমি তার চক্ষু হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, আমি তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে কিছু ধরে, আমি তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলে অর্থাৎ এসব অঙ্গ আমার আদেশের অনুগত হয়ে কাজ সম্পাদন করে। আর সে আমার কাছে সওয়াল করলে আমি অবশ্যই তা দিয়ে দেই। আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে, আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় প্রদান করি।’ –সহিহ বোখারি

রাতের ইবাদত অর্থাৎ তাহাজ্জুদের নামাজ গুরুত্বপূর্ণ নফল আমল
সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ

সবসময় জিহবা, অন্তর, কাজ এবং অবস্থার মাধ্যমে আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করা। এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! নিশ্চয়ই ইসলামের বিধি-বিধানগুলো আমাদের ওপর আধিক্যতা লাভ করেছে। তাই আমাদের এমন এক ব্যাপক বিষয় শিক্ষা দিন, যা আমরা আঁকড়ে ধরব। উত্তরে তিনি বললেন, তোমার জিহবা যেন সর্বদা আল্লাহর স্মরণে ভেজা থাকে।’ – ইবনে মাজাহ

আল্লাহর ভালোবাসা অগ্রাধিকার

কুপ্রবৃত্তির অত্যাধিক তাড়নার সময় নিজের প্রবৃত্তির ওপর মহান আল্লাহর মহব্বতকে অগ্রাধিকার দেওয়া। শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন, ‘কোনো নফস যখন কোনো খারাপ ইচ্ছা করে আর ব্যক্তিটি নিজের নফসকে খারাপ থেকে নিষেধ করে, তখন এ নিষেধটি আল্লাহর ইবাদত ও সওয়াবের কাজে পরিণত হয়।’ – মাজমুআল ফাতাওয়া : ৬৩৫/১০

আল্লাহর নাম ও গুণগুলোকে অন্তর দিয়ে অনুধাবন

মহান আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলীকে অন্তর দিয়ে অনুধাবন, ভালোভাবে অবলোকন করা এবং উত্তমভাবে জানা। ইবনুল কাইয়্যুম (রহ.) বলেন, ‘আসল জ্ঞানী ওই ব্যক্তি, যে আল্লাহতায়ালাকে তার নাম, গুণ ও কার্যাবলীসহ জানে এবং তার কাজকর্মে আল্লাহকে সত্য প্রমাণিত করে। তার যাবতীয় কাজের নিয়ত ও ইচ্ছাকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে।’

আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি খেয়াল রাখা

আল্লাহতায়ালার অসংখ্য-অগণিত নেয়ামতের প্রতি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা। তার অগণিত বাহ্যিক ও গোপন নেয়ামত এবং বান্দার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত রহমতকে অবলোকন করা। আর এ ধরনের গভীর মনোনিবেশ বান্দাকে আল্লাহর মহব্বতের দিকে পরিচালিত করে, আল্লাহর সন্তুষ্টি মেলে।

সবকিছুকে আল্লাহর হুকুমের সামনে তুচ্ছ ভাবা

এটি অন্যসব উপায়সমূহের মধ্যে অত্যধিক গুরুত্বের দাবি রাখে। অন্তরকে পুরোপুরি আল্লাহর সামনে, আল্লাহর হুকুমের সামনে তুচ্ছ মনে করা। এর অর্থ হলো, আল্লাহর হুকুমকে প্রাধান্য দেওয়া। সর্বদা আল্লাহর সামনে নিজেকে ছোট করে দেওয়া, হেয় করে দেওয়া ও অবনত করা।

রাতের ইবাদত

রাতের ইবাদত করা। আল্লাহতায়ালা যখন দুনিয়ায় আকাশে আগমন করেন তখন তার সঙ্গে ইবাদতের মাধ্যমে মহব্বত বৃদ্ধি করা যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তাদেরকে পালনকর্তা যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে তার ব্যয় করে।’ –সুরা আস সাজদা : ১৬

ঈমানদারদের সঙ্গে সময় কাটানো

ঈমানদারদের সঙ্গে সময় কাটানো। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বলেন, আমার উদ্দেশ্যে পরস্পর মহব্বতকারীর জন্য আমার মহব্বত অবধারিত হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, আমার উদ্দেশ্যে পরস্পর মহব্বতকারীর জন্য আমার মহব্বত অবধারিত হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, আমার উদ্দেশ্যে পরস্পর মহব্বতকারীর জন্য আমার মহব্বত অবধারিত হয়ে যায়।’ -মিশকাত

গোনাহ থেকে দূরে থাকা

সব ধরনের গোনাহ থেকে দূরে থাকা। ওই সব কারণ থেকেও দূরে থাকা, যেগুলো আল্লাহ ও তার বান্দার অন্তরের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দেয়। গোনাহের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে।