যেসব কারণে ‘গ্ল্যামার কুইন’ সুচিত্রা সেন অনন্য

বিনোদন ডেস্ক : বাঙালির ‘গ্ল্যামার কুইন’ সুচিত্রা সেন। যিনি খ্যাতির শীর্ষে, জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, ক্যারিয়ারের চূড়ান্ত শিখরে ছিলেন। এ অবস্থাতেই স্বেচ্ছায় চিরকালের জন্য পর্দার অন্তরালে চলে যান তিনি। প্রায় ৩০ বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে নীরবে-নির্জনে ছিলেন রহস্যময়ী হয়ে। টানা তিন যুগ ঘরের মধ্যে থাকলেও তার জনপ্রিয়তা এক বিন্দু কমেনি। বরং বছরের পর বছর নিজেকে সমস্ত কিছু থেকে গুটিয়ে নিলেও মানুষের হৃদয়ে তার প্রতি ভালোবাসা আর আকর্ষণ থেকেই যায়। তাকে একবার দর্শনের জন্য নামজাদা অভিনয়শিল্পীরাও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতেন। পর্দায় সুচিত্রা সেনের অপূর্ব উপস্থিতি, রোম্যান্টিক চরিত্রে একাকার হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, পরিপাটি দাঁত, মাধুরীমাখা হাসি, টানা মায়াবী চোখ, মধুমাখা কণ্ঠস্বর, বঙ্কিম গ্রীবা—সব মিলিয়ে বাঙালি সৌন্দর্যবোধের নিখুঁত মিশ্রণ তাঁকে দিয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের দর্শকদের হূদয়ে স্থান, করে তুলেছে মহারানি। পর্দার বাইরে তাঁর ঋজু ব্যক্তিত্ব, স্বেচ্ছা-নির্বাসন, রহস্যময় আচরণ ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে তাঁকে করে তুলেছে অপ্রাপ্য, জন্ম দিয়েছে তীব্র আগ্রহ ও কৌতূহল।

জনপ্রিয়তা আর খ্যাতি যে তার নিজ সিদ্ধান্ত থেকে এক বিন্দু পিছু হটায়নি তা বোঝা যায় একটি ঘটনায়। ২০০৫ সালে তাকে ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘দাদা সাহেব ফালকে’ এর জন্য মনোনীত করা হলো তাকে। পুরস্কারটি নিতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সশরীরে। কিন্তু তার আপত্তি, তিনি যেতে পারবেন না। মহানায়িকা বুঝি একেই বলে। যিনি খ্যাতি, জনপ্রিয়তা, লোভ, ক্যারিয়ার সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে ছিলেন। না, মৃত্যুর পরও তাঁর মুখ দেখা গেল না। অদেখাই রয়ে গেলেন তিনি। কলকাতার বেল ভিউ ক্লিনিক, তাঁর বালিগঞ্জের বাড়ি কিংবা কেওড়াতলা শ্মশানঘাটের সামনে জড়ো হওয়া উৎসুকমানুষ দেখতে পেল না প্রিয় মহানায়িকার মুখ। সুচিত্রা সেন রুপালি জগৎ ছেড়েছেন ১৯৭৮ সালে। শেষবারের মতো লোকসমক্ষে এসেছিলেন ১৯৮৯-তে। তারপর সেই যে স্বেচ্ছানির্বাসনে গেলেন, আর কখনোই কেউ তাঁকে দেখেনি—মুনমুন, রাইমা, রিয়া আর অতি প্রয়োজনীয় কয়েকজন ছাড়া। নিজের চারদিকে গড়ে নেওয়া রহস্যময়তার ঘেরাটোপেই থেকেছিলেন বছরের পর বছর। তারপর, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪। চলে গেলেন সবার চোখের আড়ালেই। নিজেকে আড়াল করে ভালোই করেছেন সুচিত্রা সেন। মানুষের চোখের সামনে তিনি বুড়িয়ে যাননি আর। সেই যে নিজেকে আড়াল করলেন, আর স্থির হয়ে গেলেন একটি বয়সে এসে—এর পরও বাঁচলেন অনেক দিন, কিন্তু ছবির মতোই জনমানসে থেকে গেলেন রোমান্টিক নায়িকা হয়েই।

উল্লেখ্য, মহানায়িকার জন্ম ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল বাংলাদেশের পাবনা জেলার সদর উপজেলায়। পৈতৃক নিবাস ছিল পাবনার সিরাজগঞ্জ মহকুমার বেলকুচির ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামে (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি উপজেলা)। বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন স্থানীয় এক স্কুলের প্রধান শিক্ষক আর মা ইন্দিরা দেবী। ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান ও তৃতীয় কন্যা। তার জন্মের সময় তার বাবা ছিলেন পাটনায়। ঠাকুরদা জগবন্ধু দাশগুপ্ত নাতনির নাম রাখলেন কৃষ্ণা। কিন্তু বাবা করুণাময় পাটনা থেকে ফিরে এসে মেয়ের নাম রাখলেন রমা। বাড়ির সকলে তখন কৃষ্ণা বলে ডাকতো, স্কুলে ভর্তির সময় নাম দেওয়া হলো রমা দাশগুপ্ত। একসময় রমা নামের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেল কৃষ্ণা। বিখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও কবি রজনীকান্ত সেন ছিলেন তার আরেক ঠাকুরদা। একসময় বহু তদবির করে ভারতের পাটনা থেকে বদলি হয়ে পাবনায় চলে এলেন করুণাময় দাশগুপ্ত।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় দুই ক্লাসের মাঝের সময়ে ডেস্কের উপর বসে গল্প করতে করতে সেসময়ের রমা বন্ধুদের একদিন হঠাৎ বলেই ফেলেছিলেন ‘আমি এমন নাম করব যে, পৃথিবী চিরকাল আমায় মনে রাখবে।’ দেশভাগের কয়েক মাস আগে ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শিল্পপতি আদিনাথ সেনের ছেলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় রমার। স্বামীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে শেষের দাশগুপ্ত কেটে বসলো সেন। মূলত বিলেত ফেরত ছেলে দিবানাথ সেনকে সংসারী হওয়ার জন্য রমার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন আদিনাথ সেন। দেশভাগের কিছুদিন আগে স্বামীর সঙ্গে কলকাতায় চলে যান রমা সেন। এর পাঁচ বছর পর ১৯৫১ সালে বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত পাবনা পৌরসভার স্বাস্থ্য পরিদর্শক পদে কর্মরত থেকে অবসরে যান। আর ১৯৬০ সালে পাবনায় তাদের বাড়িটি জেলা প্রশাসনের কাছে ভাড়া দিয়ে পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে যান করুণাময় দাশগুপ্ত। এরপর আর বাংলাদেশে ফিরে আসেননি তারা। স্বামী দিবানাথের মামা ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার বিমল রায়। একবার বিমল রায় রমা সেনকে দেখে পারিবারিক আলোচনায় চলচ্চিত্রে আনার জন্য দিবানাথ ও তার শ্বশুর আদিনাথকে প্রস্তাব দেন।

রাজি হয়ে গিয়েছিলেন দিবানাথ ও আদিনাথ। মূলত স্বামী দিবানাথ সেনের ইচ্ছেতেই রমা সেনের চলচ্চিত্রে আসা। তার হয়ে অগ্রিম পারিশ্রমিকও নিয়ে ফেলেছিলেন দিবানাথ সেন। শেষ পর্যন্ত এক ‘অনিচ্ছুক শিল্পী’ হিসেবে ‘শেষ কোথায়’ চলচ্চিত্রের জন্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন রমা সেন। এই চলচ্চিত্রের মধ্যে দিয়েই তার চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় কিন্তু অর্থাভাবে একসময় এই চলচ্চিত্রটি আর কখনোই মুক্তি পায়নি। ‘শেষ কোথায়’ চলচ্চিত্র মুক্তি না পেলেও নেপথ্য গায়িকা হিসেবে স্টুডিওতে গিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। শুটিংয়ের এক পর্যায়ে চলচ্চিত্র পরিচালক সুকুমার দাশগুপ্ত বললেন, তোমার নামটা তো পাল্টাতে হবে। এই নাম চলবে না। তারপর নাম নিয়ে ভোট হলো চলচ্চিত্র ইউনিটের মধ্যে। অনেকে নানা নাম বললো, হঠাৎ সহকারী পরিচালক নিতিশ রায় বললেন, ‘সুচিত্রা সেন’। সবার এই নাম পছন্দ হলো। চলচ্চিত্রে রমা উদয় হলেন সুচিত্রা নামে।