শ্রীলংকায় কাঁঠাল খেয়ে যেভাবে বেঁচে আছে প্রচুর মানুষ

এক বছর আগে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সঙ্কটে বিক্ষুব্ধ জনতার রোষের মুখে প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসা ক্ষমতাচ্যূত হবার পর দেশটি এখন দারিদ্রে ধুঁকছে। খাবার জোগাড়ে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির বড় একটা জনগোষ্ঠি। একসময় ফল হিসাবে সবচেয়ে অবজ্ঞা করা হতো যে কাঁঠালকে সেটাই এখন মানুষের প্রাণরক্ষাকারী আহার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৫ কেজি কাঁঠাল পাওয়া যায় প্রায় এক ডলার সমমূল্যে। শ্রীলংকার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে রয়েছে। এখন প্রতি দুটি পরিবারের মধ্যে একটিকে বাধ্য হয়ে তাদের আয়ের ৭০% এর বেশি ব্যয় খাবারদাবারের ওপর করতে হচ্ছে।

দিন মজুর কারুপ্পাইয়া কুমার বলছিলেন, কাঁঠাল খেয়ে আমরা লাখ লাখ মানুষ প্রাণে বেঁচে আছি। অনাহারের হাত থেকে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে এই কাঁঠাল। অর্থনৈতিক সঙ্কটের আগে প্রতিটি মানুষের ভাত বা পাউরুটি কেনার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু এখন খাবারের দাম এতটাই নাগালের বাইরে চলে গেছে যে বহু মানুষ প্রায় প্রতিদিন কাঁঠাল খেয়ে আছে।

শ্রীলংকা তার ইতিহাসে নজিরবিহীন সবচেয়ে গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটে নিমজ্জিত হয় ২০২২ সালে। দেশটির অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় এর পর থেকে মানুষের আয় সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়েছে। সঙ্কটে বিপর্যস্ত দেশটিতে বিরামহীন বিদ্যুতের অভাব আর জ্বালানির মজুত ফুরিয়ে আসার পটভূমিতে যে তীব্র জনরোষ সৃষ্টি হয়েছিল তার জেরে জনগণ প্রেসিডেন্ট গোটাাবায়া রাজাপাকসার সরকারি বাসভবনে চড়াও হয় গত বছর ৯ জুলাই। এরপর দেশ ছেড়ে পালান রাজাপাকসা। এরপর দেশটির সরকার দেনদরবার করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ থেকে ঋণ জোগাড় করতে সমর্থ হলেও দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে দারিদ্র দ্বিগুণ বেড়েছে।

বিপর্যস্ত গ্রামীণ অর্থনীতি ও জনজীবন
রবার আর চা বাগানের সবুজে ঢাকা পাহাড়গুলোর মাঝখানে রত্নাপুরা শহর, কলম্বোর প্রায় ১০০ মাইল (১৬০ কিমি) দক্ষিণে। কারুপ্পাইয়া কুমার জীবিকার তাগিদে নারিকেল গাছে উঠে নারিকেল পাড়েন। প্রতিবার ওঠায় তার আয় হয় ২০০ শ্রীলংকান রুপিা (৬৫ সেন্টের সম পরিমাণ)। তিনি বলেন, জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচও টানতে হয়। কাজেই খাবার কেনার জন্য খুবই কম পয়সা হাতে থাকে।

কারুপ্পাইয়ার স্ত্রী রবার চাষের কাজ করে অর্থ উপার্জন করেন। রবার গাছের কাণ্ডে খাঁজ কাটার কাজ করেন তিনি, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা রবার সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু বর্ষার মরশুমে সে কাজ এখন বন্ধ। “বৃষ্টি হলেও ঘরে বসে থাকার উপায় আমার নেই। বৃষ্টির মধ্যেই আমাকে নারিকেল গাছে উঠে নারিকেল পাড়তে হয়। পরিবারের ভরনপোষণ তো করতে হবে,” বলেন মি. কুমার, যিনি এই কাজের ঝুঁকি সম্পর্কে পুরো ওয়াাকিবহাল।

দক্ষিণাঞ্চলে পাশেই বেশ কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি এলাকা পালেন্দা। সেখানে বাস করেন প্রায় দেড়শ’টি পরিবার। তাদের প্রায় সবাই কৃষক ও শ্রমজীবী। স্থানীয় সরকারি স্কুলে দেখলাম প্রিন্সিপাল ও কয়েকজন শিক্ষক প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের ওজন নিচ্ছেন এবং খাতায় তা নোট করছেন।

স্কুলের প্রিন্সিপাল ওয়াজির জহির জানান, বেশিরভাগ বাচ্চাদের পরিবারই গত বছর দারিদ্রসীমার নিচে গিয়ে পৌঁছেছে। কাজেই আমরা এসব পরিবারের শিশুদের স্কুলের জন্য বরাদ্দ কিছু খাবার দিতে শুরু করেছি। আগে স্কুলের খাবারে সপ্তাহে দুটো করে ডিম দেয়ার রেওয়াজ ছিল। এখন খাদ্য পণ্যের দাম এত বেড়েছে যে সপ্তাহে আমরা একটা করে ডিম দিচ্ছি। কিছু প্রোটিন তো লাগবেই। প্রায় অর্ধেক শিশুর ওজন বয়স আন্দাজে কম এবং তারা অপুষ্টির শিকার।

এক বছরের ওপর অর্থনৈতিক কঠিন অবস্থা চলার কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। দেশটির দুই কোটি বিশ লক্ষ মানুষের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার কথা। শ্রীলংকা প্রায় ৮৫% ওষুধ বাইরে থেকে আমদানি করে। কাজেই অর্থনৈতিক সঙ্কট যখন শুরু হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ে ঘাটতি তৈরি হয়, তখন থেকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধপত্রের ব্যাপক অভাব দেখা দিয়েছে।

ইতোমধ্যেই মানুষজনকে সতর্ক করে শ্রীলংকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেহেলিয়া রাম্বুওয়েলা বলেছেন, যে চড়া দাম এবং ঘাটতি থেকে অবিলম্বে পুরো পরিত্রাণের সম্ভাবনা নেই। ভেবে দেখুন- আমাদের যে স্বল্প পরিমাণ সঞ্চিত মুদ্রা আছে তা দিয়ে আমরা কী আমদানি করব সেই কঠিন সিদ্ধান্ত আমাদের নিতে হচ্ছে – খাদ্যদ্রব্য নাকি ওষুধ? অনাহারে থাকার সঙ্কট এড়াতে আমাদের তো খাবার আমদানি করতে হবে। তবে পায়ের তলায় এখন কিছুটা মাটি তৈরি হয়েছে এবং পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে উন্নতি হবে।

কিন্তু সাধারণ মানুষকে তাদের বেঁচে থাকার পথ এখন নিজেদেরই খুঁজে নিতে হচ্ছে। কারুপ্পাইয়া বলেন, আগে কাঁঠালগুলো মাঠে পড়েই পচত । এক পাত্র সেদ্ধ করা কাঁঠাল আমাদের পরিবারের পাঁচজন সদস্যকে সারাদিন খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট। তার প্রতিবেশিদের সাথে তিনি একটা অভিনব “চুক্তি” করেছেন কারণ তার জমিতে কোন কাঁঠাল গাছ নেই। আমি প্রতিবেশিদের কাঁঠাল গাছে উঠে তাদের জন্য কাঁঠাল পেড়ে দিই- তার জন্য কোন পয়সা নিই না- তারা দিতে চাইলেও নিই না। আমি বরং বিনিময়ে তাদের গাছ থেকে একটা করে কাঁঠাল বাসায় নিয়ে যাই। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তার আস্থা নেই- কিন্তু আস্থা আছে প্রকৃতির ওপর। কাঁঠাল আর নারকেল গাছগুলোই আমার কাছে বাপমায়ের মত।


সূত্র : বিবিসি বাংলা