সলাতুল ইস্তিসকা: বৃষ্টির জন্য যেভাবে নামাজ পড়বেন

বৃষ্টি না হলে প্রখর রোদ্রের তাপ আর তীব্র গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে মানুষ। অনাবৃষ্টির কারণে জমির ফসলও পুড়ে যায়। সে অনুকূল কঠিন পরিস্থিতিতে কী করবে মানুষ? শিখিয়ে দিয়েছেন আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মদ রাসুল সা.। তিনি এ গরমের প্রচণ্ড তাপদাহ থেকে বাঁচতে ও বৃষ্টি প্রার্থনা করতে নামাজ আদায় করতে বলেছেন। আর সে নামাজের নামই সালাতুল ইস্তিসকা।

ইস্তিসকা এর অর্থ পানি প্রার্থনা করা। অনাবৃষ্টিতে খুব বেশি কষ্ট হলে সব মুসল্লিদের নিয়ে একত্রে খোলা মাঠে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করা হয়। আর এ প্রার্থনা করাকেই ইস্তিসকার নামাজ বলে।

আলেমদের মতে, এ নামাজ মাঠে গিয়ে আদায় করার আগে পূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণপূর্বক একাধারে তিন দিন রোজা রাখবে। তারপর সংশ্লিষ্ট ওই এলাকার ইমাম বা খতিব সাহেব মুসল্লিদের নিয়ে বসবেন, নসিহত করবেন, উপদেশ দেবেন। তিন দিনের রোজা শেষে চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিনে মাঠে গিয়ে নামাজ আদায় করবেন। মাঠে যাওয়ার আগে এবং পরে সবাই তওবা করবেন। তওবা করলে বৃষ্টি বর্ষণের খুবই সম্ভাবনা থাকে।

ইস্তিসকার নামাজের বর্ণনা

এক. ইস্তিসকার নামাজ দুই রাকাত। আযান ইকামতবিহীন প্রকাশ্য কিরাআতে উক্ত নামাজ আদায় করতে হয়।

দুই. মুসল্লি প্রথম রাকাতে তাকবীরে তাহরিমার পর সাতবার তাকবীর দেবে। আর দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচ বার তাকবীর দেবে।

তিন. প্রত্যেক তাকবীরের সময় হাত উঠাবে এবং তাকবীরগুলোর মাঝে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পড়বে।

চার. নামাজের পর ইমাম খুতবা দিবেন। খুতবায় বেশি বেশি ইস্তেগফার ও কুরআন তিলাওয়াত করবেন। অতঃপর দু’হাত উঠিয়ে মিনতির সঙ্গে দুআ করবেন এবং হাদীসে বর্ণিত দুআগুলো বেশী পড়বেন।

ইস্তিসকার নামাজের কিছু আহকাম

এক. ইস্তিসকার নামাজের পূর্বে ওয়াজ নসীহত করা, মানুষের হৃদয় গলে এমন কথা বার্তা বলা, যেমন গুনাহ থেকে তাওবা করার গুরুত্ব তুলে ধরা। জুলুম অন্যায়ভাবে হাতিয়ে নেয়া সম্পদ তার হকদারের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা; কেননা মানুষের পাপ-গুনাহের কারণেই বৃষ্টিপাত বন্ধ করে দেয়া হয়। আর তাওবা ইস্তিগফার ও তাকওয়া অর্জন, দুআ কবুল হওয়া এবং খায়ের ও বরকত লাভের কারণ। অনুরূপভাবে মানুষদের এ উপলক্ষে দান খয়রাতের ব্যাপারেও উৎসাহ দেয়া; কেননা দান খয়রাত আল্লাহর রহমত আকৃষ্ট করার কারণ।

দুই. ইস্তিসকার নামাজের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট দিন ঠিক করা, যাতে মানুষ ওই দিনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষায় থাকে।

ইস্তিসকার নামাজে খুশু-খুজু, বিনয়- নম্রতার সাথে গমন করা সুন্নত। সাথে সাথে একমাত্র আল্লাহ তাআলাই যে বান্দার সকল হাজত-প্রয়োজন পূরণ করেন এ মনোভাবও অন্তরে জাগ্রত রাখা উচিত। ইবনে আব্বাস রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইস্তিসকার নামাজের জন্য বের হওয়ার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনাড়ম্বরভাবে, বিনয়-নম্রতা ও আকুতিসহ বের হয়ে নামাজের মাঠে উপস্থিত হয়েছেন। (আবু দাউদ শরীফ)

তিন. ইস্তিসকার খুতবায় হাত উঠিয়ে বেশি বেশি দুআ ও ইস্তিগফার করা।

ইসতিসকার দোয়া

ইসতিসকার নামাজ আদায়ের ব্যাপারে ইমামদের মধ্যে নিয়ম এবং তরতিবে কিছুটা মতপার্থক্য বোঝালেও আল্লাহ তাআলার কাছে নিচের দোয়াটি পাঠ করা খুবই কল্যাণকর ও বরকতময়। কারণ এ দোয়াটি স্বয়ং হজরত মুহাম্মদ সা. বৃষ্টির জন্য পাঠ করতেন। আয়েশা রা. বলেন, লোকজন রাসুলুল্লাহ সা.-এর কাছে অনাবৃষ্টির কষ্টের কথা নিবেদন করলে রাসুলুল্লাহ সা. ঈদগাহে সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে নিচের দোয়া করেন। অতঃপর আল্লাহর হুকুমে বৃষ্টি বর্ষণ হতে শুরু করে। বৃষ্টি থেকে পরিত্রাণ পেতে মানুষের ছোটাছুটি দেখে নবীজি হেসে ফেলেন। (আবু দাউদ: ১১৭৩)

দোয়াটি হলো— ‏ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ * الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ * مَلِكِ يَوْمِ الدِّينِ‏ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ اللَّهُمَّ أَنْتَ اللَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ الْغَنِيُّ وَنَحْنُ الْفُقَرَاءُ أَنْزِلْ عَلَيْنَا الْغَيْثَ وَاجْعَلْ مَا أَنْزَلْتَ لَنَا قُوَّةً وَبَلاَغًا إِلَى حِينٍ ‏

উচ্চারণ: ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। আর-রাহমানির রাহিম। মালিকি ইয়াউমিদ্দিন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ইয়াফয়ালু মা ইউরিদ। আল্লাহুম্মা আনতাল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা আনতাল গানিয়্যু ওয়া নাহলুল ফুকারাউ। আনজিল আলাইনাল গাইছা ওয়াজয়া’ল মা আনজালতা লানা কুওয়্যাতান ওয়া বালাগান ইলা হীন।’

অর্থ: ‘সব প্রশংসা পৃথিবীর প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তিনি পরম করুণাময় এবং দয়ালু ও শেষ বিচারের মালিক। আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ নেই, তিনি যা ইচ্ছা করেন, তা-ই করেন। হে আল্লাহ! তুমিই একমাত্র মাবুদ, তুমি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। তুমি ধনী, আমরা গরিব। আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করো এবং আমাদের জন্য যা অবতীর্ণ করো, তা আমাদের জন্য শক্তিময় ও কল্যাণ দান করো।’ (আবু দাউদ: ১১৭৩)

বৃষ্টিপাত হলে যা করা মুস্তাহাব

বৃষ্টিপাতের শুরুতে বৃষ্টিতে নামা ও ভেজা মুস্তাহাব। হাদীসে এসেছে, আনাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থাকা অবস্থায় আমাদের বৃষ্টি পেয়ে বসল। তিনি বলেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর কাপড় গুটালেন। তিনি বৃষ্টিতে ভিজলেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এমন করলেন কেন? তিনি বললেন, কেননা এ বৃষ্টি তার রবের পক্ষ থেকে নতুন এসেছে।