সুস্থ থাকতে হাসুন প্রাণ খুলে

একটি হাসিমাখা মুখ আনন্দময় জীবন, মানসিক শান্তি, শারীরিক সুস্থতা আর সুখের চিহ্ন বহন করে। বেশ কয়েক বছর ধরে শরীর ও মনের ওপর হাসির প্রভাব নিয়ে অগণিত গবেষণা হয়েছে। সবকটি গবেষনাতেই বেরিয়ে এসেছে হাসির নানান ইতিবাচক দিক।

প্রাণখুলে হাসলে রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ বাড়ে। হাসলে শরীরের স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণের পরিমান কমে যায়। যা শরীরকে চাপমুক্ত এবং সুস্থ রাখে। এতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। হাসলে শরীরের জন্যে ইতিবাচক হরমোন নিঃসরণ বাড়ে। এই হরমোনে এন্ড্রোফিন্স নামের একটি রাসায়নিক থাকে যার ফলে শরীর ও মনে ভালো লাগা বোধ সৃষ্টি হয়। ছয় থেকে দশ মিনিট সময় পর্যন্ত ট্রেডমিলে দৌড়ে আপনি যতটুকু ক্যালরি ঝরাতে পারবেন তার সমপরিমাণ ক্যালরি ঝরবে এক মিনিট প্রাণখুলে হাসলে। হাসলে হৃদযন্ত্রে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। এছাড়াও প্রাণখুলে হাসলে শরীরের ব্যথা বেদনা দূর হয়। এর মাধ্যমে রোগমুক্তি প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়। হাসির হিলিং অর্থাৎ রোগমুক্তির ক্ষমতাও রয়েছে।

আমাদের অনেক অনেক হাসতে হবে- হাসির এত এত ইতিবাচক দিক আমাদেরকে সেই তথ্যই দেয়। অথচ, এই প্রচন্ড অস্থির, ব্যস্ত আর অশান্ত সময়ে প্রাণখুলে হাসার উপলক্ষই তো খুব কম। এই শহরের অনেকে হয়তো মনে করতে পারবেন না শেষ কবে প্রাণখুলে হেসেছেন। জেনে নিন হাসির মন্ত্র।

ঠিক করুন হাসবেনই: অনেকেই ভাবেন সবসময় হাসিমুখে থাকার জন্যে একটা পারফেক্ট জীবনের অধিকারী হতে হবে। কিন্তু সত্যি কথা হল আমাদের কারও জীবনই শতভাগ গোছানো নয়। জীবনের নানান প্যাচঘোচ আর সমস্যার মাঝেও মুখে হাসি রাখতে হলে সবার আগে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আপনি হাসবেন। যাই কিছু ঘটুক না কেন আপনি হাসবেন প্রাণখুলে, এই সিদ্ধান্তটি নিয়মিত ব্যায়াম করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার মতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে আপনার জীবনে

সকালের রুটিনে হাসি যোগ করুন: অনেকেই প্রতিদিন সকালে উঠে কী কী কাজ করবেন তার একটা রুটিন করে রাখেন। প্রতিদিন সকালের সেই কর্মতালিকায় প্রাণখুলে হাসার বিষয়টিও যোগ করুন। সকালে উঠে জানালা খুলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে কোন কারন ছাড়াই হেসে ফেলুন। দেখবেন নির্ভার হয়ে উঠেছে আপনার মন।

মুচকি হাসুন: প্রাণখুলে হাসা আর মুচকি হাসার মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। তবে মুখে হাসি হাসি ভাব বজায় রাখাটাও একটা আনন্দময় জীবনের জন্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সারাদিনের কাজকর্মের মধ্যেও মুখে একটা মুচকি হাসির রেখা টেনে রাখুন। এতে আপনার মনের মেঘ কেটে যাবে। প্রাণখুলে হাসির শক্তি পাবেন। প্রথম প্রথম সারাক্ষণ হাসিমুখে থাকা কঠিন হবে। তাই হাসির জন্যে কিছু উপলক্ষ্য তৈরি করুন। যেমন, চা বা কফির কাপে চুমুক দেওয়ার আগে হেসে ফেলুন। শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে হাসুন, গায়ে পারফিউম মাখতে গিয়ে হাসুন, দিনের খাবার মুখে দেবার আগে একটু হাসুন। এভাবেই সারাক্ষণ হাসিকে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখার অভ্যাস রপ্ত করুন।

কৌতুক, কমিক্স আর হাসির বই পড়ুন: পত্রিকার পাতার প্রায় পুরোটা জুড়েই দেখা যায় নেতিবাচক খবর। তাতে পত্রিকা খুলে হাসিমুখ বজায় রাখা বেশ কঠিন। সব পত্রিকাতেই একটা ছোট্ট কোনায় কৌতুক বা কমিক্সের জায়গা থাকে। আমরা প্রায় অনেকেই এই অংশটি পড়িনা। তবে এখন থেকে প্রতিদিন পত্রিকা পড়ার সময় আগ্রহ নিয়ে ওই হাস্যরসাত্মক অংশটিও পড়ুন। এছাড়া ঘরে রাখুন কমিক্সের বই কিংবা যে লেখকের লেখায় আপনি সেন্স অফ হিউমার খুঁজে পান তার লেখা বই। সারাদিনের কাজের চাপকে মাথা থেকে সরিয়ে কিছুটা সময় ব্যয় করুন হাসির বই পড়ে।

রসিক লোকের সাথে বন্ধুত্ব করুন: রসিক লোকেরা দেখবেন সাধারণ একটা কথাতেও লোক হাসাতে পারে। তাদের কাজকর্মের ধাঁচটাই হয় এমন যে তাদের আশেপাশে থাকা মানুষেরা হেসে কুটিকুটি হয়। এমনই রসিক লোকেদের সাথে বন্ধুত্ব করুন। সুযোগ পেলেই তাদের সাথে সময় কাটান আর প্রাণখুলে হাসুন।

কমেডি সিরিয়াল দেখা শুরু করুন: একজন পছন্দের কমেডিয়ানকে ফলো করা শুরু করুন। টিভিতে এবং ইউটিউবে আজকাল নানান কমেডি সিরিজ দেখায়। এমনই কোন কমেডি সিরিজ দেখুন আর হাসুন প্রাণখুলে।

সঙ্গীর সাথে হাসুন: সঙ্গীর সাথে কাটানো সময়টুকু যেন হাসিমাখা হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন। একসাথে কোন হাসির মুভি দেখতে পারেন। একসাথে কোন কমেডি ক্লাবে গিয়েও সময় কাটাতে পারেন। এভাবে নিজেদের একান্ত সময়গুলোকে আনন্দময় করে তুলুন।

ছোট্ট শিশুদের সাথে সময় কাটান: খুব অল্পতেই হেসে ভেঙ্গে পড়ার অপূর্ব দক্ষতা রয়েছে ছোট শিশুদের। অবসরের কিছু সময় কাটাতে পারেন তাদের সাথে। হাসি সংক্রামক, তাই দেখবেন তাদের সাথে সাথে আপনিও বাধাভাঙ্গা হাসিতে যোগ দিয়েছেন একটা সময়। এছাড়া শিশুদের নানান অর্থহীন খেলাও হাসির খোরাক হতে পারে আপনার জন্যে!

পোষা প্রাণীর সাথে খেলুন: পোষা প্রাণীরা প্রায়ই মজার মজার সব কান্ড কারখানা করে। তাদের সাথে সময় কাটালেও আপনি পাবেন প্রাণখুলে হাসির সুযোগ।

নিজের বোকামি নিয়ে হাসুন: অনেক সময় আমরা বোকামি করে ফেলি। নিজের বোকামি নিয়ে মরমে মরে যাই। লজ্জায় চুপ করে থাকি। তবে এখন থেকে নিজের বোকামি নিয়ে নিজেই হে হে করে হাসুন। দেখবেন মনের ভার কমে যাবে।

স্ক্র্যাপবুক রাখুন: আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানান মজার ঘটনা ঘটে। পরিবারের বা আশপাশের অনেকেই অনেক মজার কথা বলে। সেই ঘটনাগুলো লিখে রাখুন একটা স্ক্র্যাপবুকে। মন মেজাজ খারাপ হলেই বা হাসতে ইচ্ছে হলেই উলটে পালটে পড়ুন। অবাক হয়ে দেখবেন আমাদের জীবনের আনাচে কানাচেই রয়েছে প্রাণখুলে হাসার কত মন্ত্র!

হাসি নিয়ে মজার মজার কোটগুলো বুলেটিন বোর্ডে লিখুন: কাজের টেবিলের সামনের বুলেটিন বোর্ডে হাসির উপকারিতা নিয়ে করা মজার মজার মন্তব্যগুলো লিখে রাখুন। এতে আপনি হাসতে না চাইলেও এই মন্তব্যগুলো আপনাকে জানাবে যে হাসিমাখা একটা দিন কত দরকার। এর ফলে নিজের অজান্তেই আপনি হেসে ফেলবেন।

রসিক লোকেদের ফলো করুন সোশ্যাল মিডিয়ায়: সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা প্রায় সবাই দিনের কোন না কোন সময় ঢুঁ দেই। সোশ্যাল মিডিয়াতে রসিক লোকেদের ফলো করলে আপনি দারুন কাজের চাপের মধ্যেও হেসে হালকা হয়ে যাবার সুযোগ পাবেন। তাদের ছোট ছোট টুইট বা ফেসবুক পোস্ট বা ভিডিও যোগাবে অফুরান হাসির খোরাক।

হাসির মেডিটেশন করুন: উপরের কোন পদ্ধতিই আপনার মুখে হাসি ফোটাতে না পারলে করতে পারেন হাসির মেডিটেশন। একটা আরামদায়ক জায়গায় বসুন। নিজের শ্বাস প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিন। গভীরভাবে শ্বাস নিন এবং ছাড়ুন। ধীরে ধীরে শরীরের সমস্ত চাপ এবং দুশ্চিন্তাকে মুক্ত করে দিন। তারপর কোন একটা হাসির ঘটনা মনে করুন যখন আপনি প্রাণখুলে হেসেছিলেন। এরপর হাসুন এবং সে হাসি ছড়িয়ে দিন সারা শরীরে। জোরে জোরে হা হা করে শরীর দুলিয়ে হাসুন। দেখবেন আপনার দিনের সমস্ত ক্লান্তি, চাপ, না পাওয়ার কষ্ট নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছে!